বৃহস্পতিবার,২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাসপাতালে গৃহবধূর মরদেহ রেখে উধাও শ্বশুরবাড়ির লোকজন

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের তেতৈতলা গ্রামে ঝর্না আক্তার (২২) নামে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করলে মরদেহ হাসপাতালেই রেখে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চলে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে রহস্যের জন্ম দিয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়; বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
মঙ্গলবার (২ জুন) রাতে উপজেলার তেতৈতলা গ্রামে স্বামী সুজন দেওয়ানের বসতঘর থেকে ঝর্না আক্তারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত ঝর্না আক্তার নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার চান্দের কীর্তি গ্রামের মৃত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে। প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয় তেতৈতলা গ্রামের বাসিন্দা সুজন দেওয়ানের সঙ্গে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ঝর্না নিজের কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। পরিবারের সদস্যরা দরজা খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে তার বোনদের খবর দেওয়া হয়। পরে ড্রিল মেশিনের সাহায্যে লোহার দরজা কেটে তাকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত তাকে প্রথমে হামদর্দ জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে গজারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হামদর্দ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আবরাহাম হোসেন ফাহিম জানান, রাত ১০টার দিকে ঝর্নাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, নিহতের বোন তাসলিমা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের পর থেকেই ঝর্নাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে তাকে তালাক দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল। এ বিষয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। বুধবার বিকেলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ঝর্নার মৃত্যু ঘটে।
তিনি আরও দাবি করেন, “আমার বোন সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। যারা মরদেহ হাসপাতালে রেখে পালিয়ে গেছে, তাদের ভূমিকা তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।”
নিহতের মামা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ঝর্নার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। মামার বাড়িতেই তার বেড়ে ওঠা। সম্ভাব্য বিচ্ছেদ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে সে মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ছিল।
ঘটনার পর অভিযুক্ত স্বামী সুজন দেওয়ানের বাড়িতে গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাসান আলী বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
স্থানীয়দের মতে, হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মরদেহ রেখে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের চলে যাওয়ার বিষয়টি ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। এখন ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পুলিশের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে ঝর্না আক্তারের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন