সোমবার,২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দেয়ালে সম্ভাবনার ফুলঝুঁড়ি, ভেতরে মৃত্যুপুরী

মজবুত সীমানা প্রাচীরের বেষ্টনীতে ঘেরা ঈশ্বরদী রেশম বীজাগার। দেয়ালে সম্ভাবনার ফুলঝুঁড়িতে সাজানো একাধিক মনোমুগ্ধকর স্লোগান দেখে যে কেউ ভেবে নেবে এ শিল্পের উজ্জল সম্ভাবনার গল্প। কিন্তু এ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি ! কেননা দেয়ালে সম্ভাবনার ফুলঝুঁড়ি দেখা গেলেও ভেতরটা পুরাই মৃত্যুপুরী।
ঈশ্বরদী পৌর শহরের প্রধান দুটি সরকারী গবেষণা মূলক প্রতিষ্ঠান ও ঈশ্বরদী-ঢাকা মহাসড়কের কোল ঘেষেই গড়ে ওঠা এক সময়ের সম্ভাবনাময় শিল্প প্রতিষ্ঠানটি এখন পরিনত হয়েছে মৃত্যু পুরীতে। প্রায় ৩৬ একরের এই বিশাল সীমানা জুড়ে এখন শুধুই ধ্বংসের গল্প লেখা। সঠিক পরিচর্চার অভাবে পরিত্যাক্ত আর জঙ্গলে পূর্ণ হয়েগেছে পুরো এলাকা। অযত্ন আর অবহেলার পলেস্তালা খসে পড়ছে ভবন গুলো থেকে।
জানাযায় প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে নিযুক্ত আছেন মাত্র একজন কর্মকর্তা। শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থানের এই প্রতিষ্ঠানে দৈনিক চুক্তিতে কাজ করেন মাত্র ২২ জন শ্রমিক। সঠিক তদারকি না থাকায় তাদেরও কাজের সুযোগ হয় মাসে ১০ থেকে ১২ দিনের। সব মিলিয়ে জনবল সংকট আর নিদারুন অবহেলায় এক সময়ের সম্ভাবনাময় এই বীজাগার এখন শুধুই মৃত্যুপুরী।
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ১৯৬২ সালে দেশের রেশম শিল্পের প্রসারে কাঁচামাল ও বীজের জোগান দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরদীস্থ বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ডাল গবেষণার সীমানা ও ঈশ্বরদী-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁসে প্রায় ১০৭ বিঘা জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই রেশম বীজাগারটি।
পরিকল্পিত এই খামারের প্রায় ৫৯ বিঘা জমিতে তুঁতগাছ আবাদ করা হতো, যা পলুপোকা পালনের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া অবশিষ্ট ৩৮ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছিল পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো, যার মধ্যে ছিল প্রশাসনিক কার্যালয়, কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবন, পলুপোকা পালনের বিশেষায়িত ঘর এবং উন্নত মানের তাঁতঘরসহ মোট ১৯টি ভবন। চাষাবাদ ও অন্যান্য প্রয়োজনে সেখানে চারটি বড় পুকুরও খনন করা হয়। এক সময়ের সেই সমৃদ্ধ কর্মযজ্ঞ ও বিশাল স্থাপনাগুলো আজ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবন গুলো। অফিস কক্ষে গজানো লতাপাতা দেখেই মনে হয় কয়েক বছর অব্যবহৃত রয়েছে এই কক্ষ গুলো। পলেস্তালা খুলে পড়তে শুরু করা ভবন গুলোতে দরজা জানালাও ভেঙ্গে গেছে অনেক আগেই।
আবর্জনায় পরিপূর্ন পুকুর গুলো দেখলেই বোঝাযায় এখানে প্রাণের অস্তিস্ব মেলা দায়। অযত্নে মরতে শুরু করেছে তুতগাছগুলো।
বীজাগারের কয়েকজন শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজনের তথ্যমতে, তুঁত চারার উৎপাদন, পলু পালন এবং উন্নতমানের রেশম গুটি ও সুতা তৈরিতে পুরো এলাকা ছিল মুখর। এখান থেকে উৎপাদিত সুতা একসময় রাজশাহীর বিখ্যাত সিল্কপল্লিতে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বকেয়ার জেরে কর্মকর্তাদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হলে ২০১৮ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। বন্ধ প্রতিষ্ঠানে তদারকিহীন ৫০ হাজার তুঁতগাছ, ভবনসহ যাবতীয় সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়ে।
দায়িত্বরত প্রহরী মিজানুর রহমান বলেন, একসময়ের এই কর্মব্যস্ত রেশম এখন শুধু নাম মাত্র তুতের চাষ হয় । যা তুতের চারা উৎপাদনের জন্য কোনোমতে টিকে আছে।
বীজাগার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে এক সময়ের লাভজনক এই রেশম উৎপাদন কেন্দ্রটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ বা সঠিক সমীক্ষা ছাড়াই পলু পালন, উন্নত মানের রেশম ডিম উৎপাদন এবং রেশম গুটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের এমন একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে এই শিল্পের সাথে জড়িত শত শত শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চরম উদাসীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং ব্যাক্তিগত স্বার্থের জন্য গৌরবময় ঐতিহ্য আজ ম্লান হতে বসেছে।
জানতে চাইলে বীজাগারের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মো. খোকন আলী বলেন, ২০১৮ সালের পর দীর্ঘ আড়াই বছর বীজাগারটি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিলো। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে এখানে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশনায় শুধুমাত্র তুঁত চারা উৎপাদন এবং চাষিদের মাঝে তা বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ পেলে অন্যান্য শাখাগুলোও দ্রুত সচল করা সম্ভব, যা রেশম শিল্পের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন