সময় যতই গড়াচ্ছে, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের অপকর্মের ফিরিস্তি ততই লম্বা হচ্ছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দেড় বছরের শাসনকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।এই দেড় বছরে শুধু দেশের অর্থনীতি নয়, আইনশৃঙ্খলা, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণ।
অর্থ পাচারেও ইউনূস সরকারের রেকর্ড দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারেও ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সম্প্রতি একটি খবর ইউনূস সরকারের দেড় বছরে অর্থ পাচার আর লুটপাটের এক অবিশ্বাস্য চিত্র উন্মোচন করেছে।
এক বছরের ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ শতাংশ বেড়েছে।
এসএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩.২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারতীয় নাগরিক ও দেশটির ব্যাংকগুলো। যদিও আগের বছরের তুলনায় তাদের আমানত ৮ শতাংশ কমেছে।বাংলাদেশ ৮৩৪.২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং ভারতের বিপরীতে বাংলাদেশের আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ। এর আগে ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত সর্বোচ্চ ৮৭১.১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছিল। এরপর দুই বছর ধারাবাহিকভাবে আমানত কমে গেলেও ২০২৪ সালে তা আবার বাড়তে শুরু করে এবং ২০২৫ সালে আরও বড় উল্লম্ফন দেখা গেল। উল্লেখ্য, সুইস ব্যাংকই বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের একমাত্র ঠিকানা নয়। বরং পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয়, তার খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ সুইস ব্যাংকে জমা হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও অবৈধ অর্থপ্রবাহের ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, ১০টি দেশ বা অঞ্চলেই বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়। এ ১০ দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেম্যান আইল্যান্ড ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস। অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে যে পরিমাণ অর্থ বৃদ্ধি পায়, তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ এসব দেশে পাচার হয়। সেই গত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এক বছরের হিসাবে এটি সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ইউনূস সরকারের দেড় বছরে অর্থ পাচারের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে।
আওয়ামী লীগের চেয়েও বেশি পাচার হয়েছে ইউনূস আমলে : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অর্থ পাচার নিয়ে তদন্তে একটি শ্বেতপত্র কমিটি গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক বলেন, ‘২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)। সুইস ব্যাংকে জমা টাকার ভিত্তিতে হিসাব করলে দেখা যায়, ইউনূস আমলে আওয়ামী লীগের গড় বার্ষিক পাচারের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি পাচার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিক ভাষণে বলেছেন, আর অর্থ পাচার হবে না। তিনি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথাও বলেছেন। পাচারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার।
এবারের বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুইস ব্যাংকের তথ্য আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন এনেছে। ইউনূস আমলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কী ব্যবস্থা নেবে বর্তমান সরকার? নাকি তাদের পাচারের বিষয়টি উপেক্ষা করা হবে?
অর্থ পাচার নিয়ে ইউনূস সরকারের মিথ্যাচার
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতিকে অর্থ পাচার রোধের বাণী শোনান। তিনি নিজের প্রচারের জন্য বিভিন্ন দেশ সফর করে অর্থ পাচার নিয়ে কথা বলেন বটে কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ইউনূস বলেছিলেন, খুব দ্রুত পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা হবে। কিন্তু ইউনূসের এ আশ্বাসও ছিল স্রেফ ফাঁকা বুলি।
ইউনূসের চেয়েও এক কাঠি সরেস ছিল তাঁর নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। যিনি পাচার হওয়া অর্থ ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আনার গল্প শুনিয়েছিলেন। রাষ্ট্রের টাকায় বিভিন্ন দেশ সফর করেন পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কথা বলে। কিন্তু বেলা শেষে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
বাস্তবে তাঁর বিরুদ্ধেই অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। গভর্নর থাকাকালেই তিনি দুবাইয়ে তাঁর মেয়ের নামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। এটা যে অর্থ পাচারের মাধ্যমে কেনা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। কারণ আহসান এইচ মনসুর বা তাঁর মেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট কেনার টাকা নিয়ে যাননি।
শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর দুর্নীতি দমন কমিশনে ইউনূস সরকারের বেশির ভাগ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ দু-একজন ছাড়া সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। বিশেষ করে সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং আসিফ মাহমুদ কেন সুইজারল্যান্ড সফর করেছিলেন সে প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামসহ ’২৪-এর আন্দোলনে জড়িত অনেকেই ইউনূস সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন।
এসব অভিযোগ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন : ইউনূস সরকার প্রকৃত অর্থ পাচারকারী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে এ ইস্যুতে নোংরা রাজনীতি করেছে। ইউনূস অর্থ পাচার ইস্যুকে তাঁর প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। অর্থ পাচারের নিরপেক্ষ তদন্তের আগেই প্রতিহিংসার কারণে অনেককে অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের হয়রানি করেছেন। তাদের মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে ইউনূস সরকার। এর ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত অর্থ পাচারকারীরা আড়ালে থেকে যায়, তেমন নতুন করে অর্থ পাচারের পথ উন্মুক্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের বেসরকারি খাত এবং অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কারা অর্থ পাচার করেছে তা সবাই জানে। কিন্তু ইউনূস সরকারের দেড় বছরে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা হয়। অর্থ পাচারকারী অনেকের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইউনূস সরকারের কিছু উপদেষ্টা। তাদের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন অনেক উপদেষ্টা এবং তাঁদের স্বজনরা। এই অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জনগণের দাবি। আশা করি বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের পতনের পর যারা বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশ যদি বিগত ১৭ বছরের পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি পাল্টে যাবে। আর অর্থ পাচার রোধ করতে হলে সব পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কারা আওয়ামী লীগের, কারা অন্তর্বর্তী সরকারের সেই বাছবিচার করা চলবে না। এমনকি বিএনপির কেউ যদি অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকেন তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থ পাচারকারী এবং দুর্নীতিবাজদের কোনো দল নেই। তাদের পরিচয় একটাই-তারা দেশের শত্রু, জনগণের শত্রু।


