খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক পরিদর্শক তৈমুর ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নানা আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
তবে তার দীর্ঘ কর্মজীবন, অপরাধ দমনে ভূমিকা এবং ব্যক্তিগত সততা নিয়ে স্থানীয় জনগণ ও সহকর্মীদের একটি বড় অংশ ইতিবাচক মূল্যায়ন করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, সচেতন নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খুলনা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তৈমুর ইসলাম সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
তার নেতৃত্বে পরিচালিত একাধিক অভিযানে চিহ্নিত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসে এবং নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে বলে অনেকের অভিমত।
অপরাধবিরোধী অবস্থানের কারণে বিরাগভাজন?
তৈমুর ইসলামের ঘনিষ্ঠজন ও সমর্থকদের দাবি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন।
বিশেষ করে মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনার ফলে নানা সময়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণেও তিনি নতুন করে একটি মহলের রোষানলে পড়েন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি
পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলামের চাকরি জীবন শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ ছিল। ২০০১ সালে চাকরিজীবনের শুরুতে তিনি চাকরিচ্যুত হন। তবে আইনি লড়াই চালিয়ে গিয়ে ২০১০ সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল হন এবং বকেয়া বেতন, রেশন ও অন্যান্য সুবিধাসহ পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ লাভ করেন।
চাকরিতে ফিরে এসে তিনি নতুন উদ্যমে দায়িত্ব পালন শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে একজন দক্ষ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চনার অভিযোগ
তৈমুর ইসলামের পরিচিতজনদের দাবি, ছাত্রজীবনে তিনি খুলনার আজম খান কমার্স কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় অতীতের বিভিন্ন সময়ে তিনি প্রশাসনিকভাবে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, চাকরিতে পুনর্বহালের পর দীর্ঘ সময় তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হয় এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়ন করা হয়। তবুও তিনি দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন।
পদোন্নতি ও পেশাগত সাফল্য
২০১৩ সালে এসআই পদ থেকে পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) পদে পদোন্নতি লাভ করেন তৈমুর ইসলাম। এরপর তিনি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদা, হাইওয়ে পুলিশ, রিজার্ভ অফিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তিনি হবিগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে বরিশালে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে খুলনা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে যোগদান করেন। খুলনায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন আলোচিত অপরাধী চক্র, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আলোচনায় আসেন।
বৃক্ষপ্রেমী ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা
পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তৈমুর ইসলামের আরেকটি পরিচয় হলো তার পরিবেশপ্রেম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় গাছ সংগ্রহ এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।
খুলনার হাদিস পার্ক, ডিআইজি কার্যালয়, পুলিশ লাইনস, সারদা পুলিশ একাডেমিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার উদ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। ২০২১ সালে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত অবস্থায়ও তিনি বৃক্ষায়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ষড়যন্ত্র নাকি বাস্তবতা?
তৈমুর ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ ও বিতর্ক নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন থাকলেও তার সমর্থকদের দাবি, তিনি মূলত কর্মদক্ষতা, সততা এবং অপরাধবিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণেই একটি চক্রের বিরাগভাজন হয়েছেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, যেকোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যেন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা হয় এবং একই সঙ্গে তার ইতিবাচক অবদান ও পেশাগত সাফল্যও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ পরিদর্শক তৈমুর ইসলামের বিষয়ে সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।


