টাকার অংকটা মাত্র ৫০ হাজার। কিন্তু এই সামান্য টাকার বিনিময়ে গত এক দশক ধরে জিম্মি হয়ে আছে দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার ১০ নং পুনট্টি ইউনিয়ন পরিষদ, ২ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত গমিরা হাট গুচ্ছগ্রামের শত শত অসহায় মানুষের ভাগ্য। একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার মালিকানাধীন পুকুর লিজের নামে প্রভাবশালী চক্রের কবজায় চলে যাওয়ায় এখন পুষ্টিহীনতা আর বঞ্চনার শিকার হচ্ছে পুরো গুচ্ছগ্রাম।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য:
সরেজমিনে গমিরা হাট গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বিশাল এই পুকুরটি এখন সাধারণ মানুষের জন্য ‘নিষিদ্ধ এলাকা’। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, একসময় এই পুকুরটি ছিল তাঁদের বিপদের বন্ধু। গ্রামের কোনো অসহায় পরিবারের মেয়ের বিয়ে কিংবা কারো মৃত্যুতে জানাজা বা শ্রাদ্ধের আয়োজন হলে, এই পুকুর থেকে মাছ ধরে সেই অভাবী পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়া হতো। শৈশব থেকে এই মানবিক প্রথা দেখে বড় হওয়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেই পুকুর এখন কেবলই দীর্ঘশ্বাসের নাম।
সামান্য টাকায় অধিকার হরণ:
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, জনৈক মোঃ জাকিরুল ইসলাম এবং আমিনুল ইসলাম বাবু নামক দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি মাত্র ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকার বিনিময়ে পুকুরটি লিজ নিয়ে একচ্ছত্রভাবে বাণিজ্যিক মাছ চাষ করছেন। এই লিজের মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত দেখানো হলেও এলাকাবাসীর প্রশ্ন—একটি আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংস্থা কীভাবে মাত্র নগণ্য কিছু টাকার বিনিময়ে শত শত ভূমিহীন মানুষের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নিতে পারে? ৫০ হাজার টাকা কি কয়েকশ’ মানুষের খাদ্যের অধিকারের চেয়ে বড়?
অফিসে গেলেই জোটে দুর্ব্যবহার ও হুমকি:
অভিযোগ রয়েছে, এলাকাবাসী যখনই এই অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন, তখনই কর্মকর্তাদের চরম কুরুচিপূর্ণ ও অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এমন রুক্ষ ব্যবহারের কারণে অসহায় মানুষগুলো এখন ভয় ও লজ্জায় আর কোথাও যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। এর ওপর প্রভাবশালী দখলদাররা রাজনৈতিক দাপট ও মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে গত ১২ বছর ধরে সাধারণ মানুষের মুখ বন্ধ করে রেখেছে।
হাতাশায় গুচ্ছগ্রামবাসী:
এলাকার সন্তান ও উদীয়মান তরুণ নেতা মোঃ দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এই গমিরা হাট গুচ্ছগ্রামের মাটিতেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকে দেখেছি আমাদের মা-বাবা ও প্রতিবেশীরা কীভাবে এই পুকুরটিকে নিজেদের সম্বল মনে করতেন। আজ সামান্য ৫০ হাজার টাকার লোভে সেই অধিকার হরণ করা হয়েছে। আমরা অবিলম্বে এই বৈষম্যমূলক লিজ বাতিল করে পুকুরটি পুনরায় এলাকাবাসীর মাছ চাষ ও ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
বর্তমানে গমিরা হাট গুচ্ছগ্রামের কয়েকশ’ পরিবার এখন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তাঁদের দাবি—অবিলম্বে এই পুকুরটি দখলমুক্ত করে তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।


