সোমবার,২২শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মাদকের টাকায় গাজীপুরে সম্পদের পাহাড়, মহাখালীর ‘শীর্ষ মাদক কারবারি’ ফর্মা সোহেল

যুগান্তরের পর যুগান্তর ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সোর্স’ বা ফর্মা হিসেবে কাজ করা সোহেল এখন রাজধানীর একাংশ ও গাজীপুরের অন্যতম শীর্ষ মাদক সম্রাট। ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সাময়িক নিষ্ক্রিয়তাকে পুঁজি করে রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন এই ‘ফর্মা সোহেল’। মহাখালীর সাততলা বস্তি থেকে শুরু করে গুলশান-বনানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় একক মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। মাদক ব্যবসার অবৈধ টাকায় গাজীপুরে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল পাঁচতলা বাড়িসহ কোটি টাকার সম্পদ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৫ই আগস্টের পর রাজধানীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের অধিকাংশ এলাকায় মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সোহেল এবং র‌্যাবের হাতে নিহত সাবেক মাদক ব্যবসায়ী পিংকুর স্ত্রী সীমার হাতে। মহাখালী, সাততলা বাউন্ডারি বস্তি, আদর্শ নগর বস্তি, লাল মাটি বস্তি, স্টাফ কোয়ার্টার বস্তি, নিকেতন বাজার গেট, মহাখালী পুকুরপাড়, কড়াইল বস্তি, টিভি গেট ও ওয়ারলেস গেটসহ বিশাল এলাকায় নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন তারা।
যেভাবে চলে ‘সোহেল-সীমা’ সিন্ডিকেট
পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে ফর্মা সোহেল অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সোহেল নিজে মাদকের বড় চালান এনে তা বুঝিয়ে দেন সীমার কাছে। সীমা সেই চালান আলমগীরসহ ৫/৬ জনের একটি বিশ্বস্ত ‘সেলার টিম’-এর মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে সাততলা বস্তির বিভিন্ন পয়েন্টে সোহেল ও সীমার বেতনভুক্ত পাহারাদার রয়েছে। সন্দেহভাজন কেউ বস্তিতে ঢুকলেই সেই খবর চলে যায় মূল হোতাদের কাছে। ফলে প্রায়শই তাদের সহযোগীরা মাদকসহ গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান মূল কারবারি সোহেল ও সীমা।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ই আগস্টের পূর্বে সোহেল মাদক ব্যবসায়ীদের প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে রক্ষা করার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নিজের নামে থাকা মাদকের একাধিক মামলাও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে রফা দফা করেছেন। বর্তমানে বিএনপির নামধারী কিছু অসৎ নব্য নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন তিনি। কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো পুলিশ দিয়ে মামলার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কয়েক বছর আগেও যার দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস ছিল না, সেই সোহেল এখন কোটি টাকার মালিক। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরের গাছা থানা এলাকায় সোহেলের একটি বিলাসবহুল পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য কোটি টাকার ওপরে। এছাড়া স্থানীয় একটি মার্কেটে রয়েছে তার একাধিক দোকান। অথচ তার বাবা চান্দু একসময় সাততলা বস্তিতে আচার বিক্রি করতেন এবং বর্তমানে নামমাত্র দোকানদারি করেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করতে ফর্মা সোহেলের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। (তবে পরবর্তীতে যোগাযোগের একপর্যায়ে তিনি জানান, “আমি কোনো মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত নই। এলাকার কিছু শত্রু আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। গাজীপুরের সম্পত্তি আমার পৈতৃক এবং বৈধ ব্যবসার টাকায় করা।”
অভিযুক্ত সীমার বক্তব্য:
মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে সীমা বলেন, “আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি অত্যন্ত কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছি। সোহেলের সাথে আমার শুধু ব্যবসায়িক পরিচয়, কোনো অবৈধ মাদক সিন্ডিকেটের সাথে আমি যুক্ত নই।”
২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের দলে কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজের স্থান নেই। ৫ই আগস্টের পর কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাততলা বস্তি এলাকার মাদক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। সোহেল নামের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক কারবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স পরিচয় দিলেও অপরাধী হিসেবেই তাকে গণ্য করা হবে। তাকে এবং তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

টিকাদারের খামখালীপনা বিকল্প সড়ক না করে নিম্নমানের ব্রিজ নির্মাণ,ও কালক্ষেপণে খালের দুপাশের গ্রামবাসীর চরম ভোগান্তি

ঝালকাঠির , সুতালরি- চৌপালা রোডের  চৌপলা বাজারের কাছে কোটি কোটি