বৃহস্পতিবার,১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জাবিতে জুলাই হামলার বিচারে শাস্তি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের, পুনর্বিবেচনায় দায়মুক্তি ১৬, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে। একইসাথে, এ ঘটনায় গতবছরের ৪আগস্ট শাস্তিপ্রাপ্ত ১৮৯শিক্ষার্থীর ৪৩জনের পুনর্বিবেচনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬জনকে দায়মুক্তি ও ২০জনের শাস্তি হ্রাস করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ বিচারকে ‘প্রহসনমূলক’ আখ্যা দিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

গত সোমবার দুপুর ৪টা থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার ভোর ৪টা পর্যন্ত দীর্ঘ ১২ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান সভাপতিত্বে চলা সিন্ডিকেট সভায় এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় হামলায় মদদ দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ২১শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে একজন শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ৯ জন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তার পদাবনতি ও বেতন অবনমন করা হয়েছে। দুই শিক্ষককে সতর্ক করা হয়েছে এবং সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

শাস্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন পাঁচ বছরের জন্য দ্বিতীয় গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছে। তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক আলমগীর কবিরের বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নির্ধারণের পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদ রঙ্গন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক বশির আহমেদ, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ.স.ম ফিরোজ-উল-হাসান এবং পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন শিকদারের বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনকে আগামী পাঁচ বছর প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকেও বিরত রাখা হবে।

অন্যদিকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে প্রভাষক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধ্যাপক মামুনকে আগামী পাঁচ বছর কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সাতজন শিক্ষক ও একজন কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

পুনর্বিবেচনায় দায়মুক্তি ১৬ ও শাস্তি হ্রাস ২০ শিক্ষার্থীর
একই সিন্ডিকেট সভায় জুলাই হামলার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পুনর্বিবেচনার আবেদনও নিষ্পত্তি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এ.বি.এম আজিজুর রহমান জানান, সাজাপ্রাপ্ত ১৮৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৩ জন শাস্তি পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে ১৬ জনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, ২০ জনের শাস্তির মেয়াদ কমানো হয়েছে এবং ৭ জনের পূর্বের শাস্তি বহাল রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, আজীবন বহিষ্কৃত ২১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ জনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ৮ জনের শাস্তি কমিয়ে দুই বছর এবং ৫ জনের শাস্তি কমিয়ে এক বছর করা হয়েছে। দুই বছরের শাস্তিপ্রাপ্ত ৮ জনের মধ্যে ৬ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সনদ বাতিল হওয়া ১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, ৪ জনকে এক বছরের এবং ৩ জনকে দুই বছরের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও, ৮৩সাজাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী নতুন করে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন। আপিল কমিটি এটিও বিবেচনা করছে।

এদিকে সার্বিক বিচারকে প্রহসনমূলক ও আইওয়াশ বলছেন শিক্ষার্থীরা। অনেকে সমোঝতার বিচারও বলছেন। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকাশ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার প্রক্রিয়ার আওতায়ই আসেননি মদদদাতা অধ্যাপক জেবউননেসা ও অধ্যাপক মো. শফিক-উর রহমান। আবার, সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা, অধ্যাপক এ এ মামুনকে শাস্তির পরিবর্তে শুধু সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে, তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক আলমগীর কবিরকে স্বপদে রাখা হলেও প্রভাষক পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে সহকারী প্রক্টর সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে। এ সিদ্ধান্তে, দায়িত্ব ও অপরাধের মাত্রা অনুপাতে শাস্তির তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও, সহকারী রেজিস্ট্রার রাজিব চক্রবর্তীকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি ও ডেপুটি-রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে পদাবনতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বিচারের ক্ষেত্রে ৪৩জন সাজাপ্রাপ্তের পুনর্বিবেচনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি ও ২০ জনের শাস্তির মেয়াদ কমানো হয়েছে।

বিচারে অসন্ত্বোষ প্রকাশ করে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আনজুম শাহরিয়ার সামাজিক মাধ্যমে লিখেন, ছাত্রলীগের আজীবণ বহিস্কৃত ও সনদ বাতিল হওয়া প্রায় সবাইকে দায়মুক্তি দিয়েছে প্রশাসন। শিক্ষকদের নামমাত্র বিচার করে অনেককে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য রাজু হাসান রাজন বলেন, এ প্রহসনের বিচার ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি। এটি জুলাই চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ ছাড়াও শাখা ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও ছাত্র ইউনিয়ন এবিচাকে প্রহসনমূলক আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন