সুনামগঞ্জ পৌর শহরের দুই লেনের প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান। এই উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সুরমা নদীর সদর উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও ও জলিলপুর এলাকা থেকে ৫ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয় জে.ও.এন-জেভির পক্ষে রাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মোসাদ্দেক হোসেন বাচ্চুকে। তবে অভিযোগ উঠেছে, অনুমোদনের আড়ালে ব্যাপক অনিয়ম ও অবৈধ বালু বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ফুল মিয়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ‘আলভি আরাফ ফারাজি’ নামের একটি ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ফুল মিয়া। গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪০ দিনের জন্য অনুমতি দেওয়া হলেও জাতীয় নির্বাচন, যন্ত্রপাতির ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটের অজুহাতে জেলা প্রশাসনের অনুমোদনে আরও দুই দফায় ৩৩ দিন সময় বৃদ্ধি করা হয়। বর্ধিত সময়সীমাও শেষ হয়েছে গত ২৬ মে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অবাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি নিয়ে প্রকল্পের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই বালু শহরের বাইরে গৌরারং ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ডাম্পিং করে পরে ট্রাকযোগে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সরেজমিনে কয়েকদিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, গৌরারং ইউনিয়নের অচিন্তপুর ইটভাটার পাশে বিশাল এলাকায় বালুর স্তূপ গড়ে তোলা হয়েছে। নদী থেকে উত্তোলিত বালু ড্রেজারের পাইপের মাধ্যমে সেখানে ফেলা হচ্ছে। পরে এক্সেভেটর দিয়ে ট্রাকে লোড করে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। একের পর এক ট্রাক বালু নিয়ে বিশ্বম্ভরপুরসহ জেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করতে দেখা গেছে।
নৌকার মাঝি ও শ্রমিকরা জানান, ফুল মিয়ার নির্দেশেই তারা নির্দিষ্ট স্থানে বালু ফেলে থাকেন। তাদের দাবি, বালুকে ‘ফোর লেন প্রকল্পের বৈধ বালু’ হিসেবেই পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প এলাকার বাইরে এসব বালু ডাম্পিং ও পরিবহন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দায়িত্বশীল সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ৫ লাখ ঘনফুটের বিপরীতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৭ লাখ ঘনফুটের বেশি বালু উত্তোলন করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ১২ লাখ ঘনফুটেরও বেশি বালু বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটিরও বেশি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড্রেজার ব্যবসার মাধ্যমে ফুল মিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে তিনি জেলার বালু ব্যবসার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ড্রেজার সিন্ডিকেট—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ফুল মিয়া। তার দাবি, “ফোর লেন প্রকল্পের বালু অন্য কোথাও বিক্রি করার সুযোগ নেই। শহরের ভেতরে বালু রাখলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তাই শহরের বাইরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের বালু প্রকল্পের কাজেই ব্যবহার করা হবে।”
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সমর কুমার পাল বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদনের বাইরে বালু বিক্রি বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠেছে—উন্নয়ন প্রকল্পের নামে উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে? অনুমোদিত পরিমাণের তিনগুণেরও বেশি বালু কীভাবে উত্তোলন হলো? আর কারা রয়েছে এই সিন্ডিকেটের পেছনে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় সুনামগঞ্জবাসী।


