কড়াইলে রুবেল-শহীদ সিন্ডিকেটের ‘মাদক সাম্রাজ্য’: সোর্স পরিচয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও ত্রাস

রাজধানীর বনানী ও কড়াইল বস্তি এলাকায় এক আতঙ্কের নাম রুবেল ওরফে নাডা রুবেল এবং শহীদ ওরফে ফর্মা শহীদ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সোর্স’ পরিচয়ে এই দুই বন্ধু গড়ে তুলেছে এক বিশাল মাদক ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন দলের লেবাস নিলেও বদলায়নি তাদের অপরাধের ধরন। মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ফুটপাত দখল—সবই এখন এই জুটির নিয়ন্ত্রণে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রুবেল নিজেকে ডিবি পুলিশের সোর্স এবং শহীদ নিজেকে র‍্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় দাপটিয়ে বেড়ায়। আগে বনানী থানার নিয়মিত সোর্স থাকলেও বর্তমানে গুরুতর অভিযোগের কারণে পুলিশের আস্থা হারিয়েছে শহীদ। তবে তাতে তার দাপট কমেনি। এলাকায় অন্য কোনো মাদক ব্যবসায়ী তাদের কথা না শুনলে ডিবি বা র‍্যাব দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি প্রতিবাদী স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধেও তারা সাজানো মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ রয়েছে।
কড়াইল বস্তিকে কেন্দ্র করে ইয়াবা, গাঁজা ও হিরোইনের এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে এই দুজন। শুধু মাদক নয়, কড়াইল ও বেলতলা বস্তির চাঁদাবাজির বড় অংশই তাদের পকেটে যায়।
চাঁদাবাজির খাত: অবৈধ পিকআপ স্ট্যান্ড, গ্যাস, পানি এবং বিদ্যুৎ সংযোগ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ বস্তিবাসী। চাঁদা না দিলে জোটে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই দুজন যুবলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও বর্তমানে তারা খোলস বদলে বিএনপি নেতা সেজেছেন। স্থানীয়রা জানান, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা এলাকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া।
রুবেলের বিরুদ্ধে ভাটারা, গুলশান ও বনানী থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে শহীদের অপরাধের ইতিহাস আরও পুরোনো। ২০০৫ সালে মহাখালী হিন্দুপাড়া বস্তি থেকে অবৈধ অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গুলি ও বিস্ফোরকসহ র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল শহীদ ও তার বাহিনী। সম্প্রতি রুবেলের ফেসবুক আইডিতে আপলোড করা ছবিতে তাদের দুজনকে একটি বারে মদ্যপান করতে দেখা গেছে। এলাকাবাসী জানায়, লাইসেন্স না থাকলেও প্রায়ই তারা নামী-দামী বারে মদ্যপানে লিপ্ত হন।
ভুক্তভোগী একজন ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
“আমরা ব্যবসা করতে পারছি না। রুবেল আর শহীদকে প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয়। প্রতিবাদ করলে তারা ডিবি বা র‍্যাব দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। আমরা এখন নিজেদের এলাকায় নিজেরাই অসহায়।”
স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন,
“মুখে তারা মাদকবিরোধী কথা বলে, কিন্তু কড়াইল বস্তিতে যত মাদক ঢোকে তার সব নিয়ন্ত্রণ করে এই দুজন। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে এবং বিশাল এক সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। পুলিশ-প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এদের থামানো সম্ভব নয়।”
অভিযোগের বিষয়ে বনানী থানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,
“কারো সোর্স পরিচয় দিয়ে অপরাধ করার কোনো সুযোগ নেই। অপরাধী যে দলেরই হোক বা যার সোর্সই হোক, তথ্য-প্রমাণ পেলে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছি।”
বনানী ও কড়াইল এলাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে রুবেল ও শহীদের মতো কথিত সোর্সদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের নজরদারিই পারে এই ত্রাসের রাজত্ব চিরতরে বন্ধ করতে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন