মাত্র ১৫ বছর আগের এক সাধারণ চাকরিজীবী থেকে আজ ১৫শত কোটি টাকার পাহাড় সমান সম্পদের মালিক বনে গেছেন মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নাকোল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো: হুমায়ুন রশিদ মুহিত। তার এই রূপকথার মতো উত্থান এবং বিপুল সম্পদের ফিরিস্তি দেখে খোদ মাগুরাবাসী হতবাক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুহিতের এই অর্থ-সম্পদের আলাদিনের চেরাগের নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক এপিএস ও মাগুরা-১ আসনের সাবেক এমপি মো: সাইফুজ্জামান শিখর।অনুসন্ধানকালে জানা যায়, ২০০৮ সালের আগে হুমায়ুন রশিদ মুহিত ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর, মুহিত তার স্কুলজীবনের বন্ধু ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের ছত্রছায়ায় মাগুরায় ফিরে আসেন এবং জেলা আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় হন।শিখরের একক প্রভাবে ২০১৬ সালে একপ্রকার ভোট ডাকাতির মাধ্যমে মুহিতকে শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়। এরপর ২০১৭ সালে বহু সিনিয়র নেতাকে ডিঙিয়ে রাতারাতি তাকে শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পাইয়ে দেওয়া হয়। দলীয় ক্ষমতা হাতে পেয়ে হুমায়ুন রশিদ মুহিত নিজেকে মাগুরার ‘বিকল্প এমপি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনকে নগ্নভাবে ব্যবহার করে তিনি লিপ্ত হন টাকার পাহাড় গড়ার এক সর্বগ্রাসী খেলায়।ক্ষমতার দাপটে মুহিত মাগুরা কামারখালীর বৃহত্তর বালুমহালটি সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। গড়াইসহ একাধিক নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন তিনি। গোটা আওয়ামী লীগ আমলে বন্ধু সাইফুজ্জামান শিখরের ‘ডান হাত’ হিসেবে কাজ করেছেন মুহিত। এ সময় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ বাণিজ্য, থানা-আদালতের মামলা বাণিজ্য এবং ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মনোনয়ন বাণিজ্য করে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও, সাইফুজ্জামান শিখরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে তদবির করিয়ে ডেইরি ফার্মের নামে প্রায় ১০ কোটি টাকা কৃষিভিত্তিক ঋণ হাতিয়ে নেন মুহিত। পরবর্তীতে শিখর মাগুরা-১ আসনের এমপি হলে মুহিতের ক্ষমতা হয়ে ওঠে লাগামহীন। তিনি শ্রীপুর উপজেলার অঘোষিত গডফাদার বা ‘জমিদার’ বনে যান। একের পর এক দখল করতে থাকেন স্থানীয় হাট-বাজার, ঘাট, নদী ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি। নাকোলের রাইচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ এবং মার্কেট নির্মাণের নামেও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অবৈধ আয়ের টাকা সাদা করতে মুহিত গড়ে তোলেন ১৪ একরের বিশাল ইটভাটা। এরপর ‘ব্লু স্কাই (রশিদ গ্রুপ)’ নামে শুরু করেন রিয়েল এস্টেট ও হাউজিং ব্যবসা। ঢাকায় প্রধান কার্যালয় এবং মাগুরায় উপ-কার্যালয় খুলে তিনি আবাসন খাতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।বর্তমানে মাগুরা শহরের অন্তত ৫ থেকে ৬টি অভিজাত স্পটে তার শত কোটি টাকা মূল্যের বহুতল ভবন রয়েছে। ১. শহরের সৈয়দ আতর আলী রোডের সাবুতলা এলাকার ৭ তলা ভবন।২. কেশব মোড়ের ১০ তলা ভবন।
৩. হাজী সাহেবের রোডের ১০ তলা ভবন।৪. হাসপাতাল পাড়ার ৫ তলা ভবন।৫. নতুনবাজার বদ্দি বাড়ি এলাকার বহুতল ভবন।
এছাড়া নাকোল এলাকায় ১৪ একর জমির ওপর ইটভাটা এবং ৩ একর জমিতে বিশাল ডেইরি ফার্ম রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই সব জমির সিংহভাগই জোরপূর্বক নামমাত্র মূল্যে বা ভয় দেখিয়ে দখল করা হয়েছে।মাগুরার বাইরে ঢাকার খিলগাঁও, রামপুরা, বনশ্রী, সাভার এবং গাজীপুর এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন মুহিত। খিলগাঁও ও বনশ্রী এলাকায় তার মালিকানাধীন একাধিক ১০ তলা ভবন রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে। এখানেই শেষ নয়, মুহিত তার আত্মীয়-স্বজনদের নামে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও আমেরিকায় প্রায় শত কোটি টাকা পাচার করেছেন মর্মে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।নাকোল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বারদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান পদে থাকাকালীন সরকারি বরাদ্দের (টিআর, কাবিখা, এডিপি) সিংহভাগ টাকাই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন মুহিত। সরকারিভাবে সুষ্ঠু অডিট করলেই এই দুর্নীতির সমস্ত প্রমাণ মিলবে বলে দাবি সচেতন মহলের।গত ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর এই আওয়ামী দুর্বৃত্ত প্রথমে ঢাকায় আত্মগোপন করেন। পরে অবৈধ পথে ভারতে পালিয়ে যান। একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন। ৫ই আগস্টের পর মাগুরা ও ঢাকার বিভিন্ন থানায় মুহিতের নামে একাধিক ছাত্র হত্যার মামলা দায়ের করা হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের ধারণা, হুমায়ুন রশিদ মুহিতের এই বিপুল সাম্রাজ্যের পেছনে মূলত দেশ ছেড়ে পালানো মাফিয়া নেতা সাইফুজ্জামান শিখরের শত কোটি টাকার বেনামি বিনিয়োগ রয়েছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান এখনও অব্যাহত রয়েছে।মাগুরার সর্বস্তরের জনগণের দাবি, এই অবৈধ টাকার কুমির ও আওয়ামী দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে অনতিবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনে মামলা দায়ের করা হোক। একই সাথে অবৈধ উপায়ে অর্জিত তার সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি (বাড়ি, জমি, ইটভাটা, ডেইরি ফার্ম, মার্কেট ও হাউজিং প্রজেক্ট) বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করার জন্য দুদক চেয়ারম্যানের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলাবাসী।


