ঝিনাইদহ জেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা। জেলা রেজিস্ট্রার অফিসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছর ধরে তালাকের আবেদনে নারীর সংখ্যাই বেশি। নতুন বছরের প্রথম দুই মাসেই শুধু ঝিনাইদহ পৌর এলাকায় ৩২৫ জন নারী তালাকের আবেদন করেছেন, যা স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে জেলায় মোট ৭ হাজার ৩২৭টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়। একই বছরে ৩ হাজার ১৭৭টি দম্পতির বিচ্ছেদ ঘটে। ২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৬-এ। তবে সেই বছরই তালাক বা বিচ্ছেদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩ হাজার ৯৮৪। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিচ্ছেদ বেড়েছে ৮০৭টি, যা একটি বড় ধরনের বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন ছিল ৪০৪টি। বিপরীতে নারীদের আবেদন ছিল ১ হাজার ৩৪৬টি। এছাড়া উভয়পক্ষের সম্মতিতে বিচ্ছেদ হয়েছে ২ হাজার ২৩৪টি। এর আগেও ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭৪৬ জন নারী তালাকের আবেদন করেছিলেন, যেখানে পুরুষের আবেদন ছিল ৩৮৪টি। ধারাবাহিকভাবে নারীদের আবেদন বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে নজরে এসেছে।
উপজেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঝিনাইদহ সদরে ২ হাজার ৫৬৮টি, শৈলকুপায় ১ হাজার ৭৫৬টি, মহেশপুরে ১ হাজার ৬৩২টি, হরিণাকুণ্ডুতে ৯৯৮টি, কালীগঞ্জে ৬৫৭টি এবং কোটচাঁদপুরে ৪১৫টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে।
ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রধান সহকারী আবু বকর জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে পৌর এলাকায় ৩২৫ জন নারী তালাকের আবেদন করেছেন। স্থানীয় কাজীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তালাকের কারণ হিসেবে পারিবারিক কলহ, বনিবনা না হওয়া, সন্দেহপ্রবণতা, মাদকাসক্তি, মানসিক নির্যাতন ও যৌতুকের বিষয়গুলো বেশি উল্লেখ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বও বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ। জেলা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট এস এম মশিয়ূর রহমানের মতে, পরিবারে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতার অভাব, পাশাপাশি সন্তানদের ওপর অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকাও একটি বড় কারণ।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, বিবাহিত জীবনে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদের পথে না গিয়ে পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা প্রয়োজন। একইসঙ্গে পারিবারিক কাউন্সেলিং, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতা জোরদার করা গেলে বিবাহবিচ্ছেদের হার কমানো সম্ভব হতে পারে।


