বৃহস্পতিবার,১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সার-কীটনাশকের তুলনায় দাম বাড়েনি ধানের, লোকসানে দিশেহারা কৃষক

বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে বাড়েনি ধানের বাজারদর। ফলে বোরো মৌসুমে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষিকাজ অনেকের কাছেই এখন অলাভজনক হয়ে উঠছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ধান চাষ করতে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ধান মাড়াই পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। আর জমি লিজ নিয়ে চাষ করলে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ যোগ হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন ব্যয়ই তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে নাড়া কাটতে ২৫০ টাকা, আইল কাটতে ৩০০ টাকা, বীজ কিনতে ৫০০ টাকা এবং চারা উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার টাকা ব্যয় হয়। হালচাষে লাগে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ধান রোপণে আরও ১ হাজার টাকা খরচ হয়।

এ ছাড়া প্রথম ধাপে ফসফেট, পটাশ ও ডিএপি সার প্রয়োগে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ইউরিয়া সার ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় ২ হাজার টাকা লাগে। ভিটামিন ও কীটনাশকে ব্যয় হয় প্রায় ৩ হাজার টাকা। জমি নিড়ানিতে ৫০০ টাকা এবং সেচে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। ধান কাটতে শ্রমিক লাগালে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। তবে মেশিনে ধান কাটলে খরচ কমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় নেমে আসে। যদিও সে ক্ষেত্রে খড় পাওয়া যায় না বলে জানান কৃষকেরা। এছাড়া ধান পরিবহনে ৫০০ টাকা এবং মাড়াইয়ে আরও ৬০০ টাকা খরচ হয়।

কৃষকদের ভাষ্য, এক বিঘা জমিতে গড়ে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান উৎপাদন হয়। বর্তমানে মোটা জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৯০০ থেকে ৯১০ টাকায়। শুভলতা জাতের ধান ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা এবং ব্রি-২৯ জাতের ধান ৯৫০ থেকে ৯৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রতি বিঘা জমির খড় বিক্রি করে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করা যায়।

উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের কৃষক হযরত আলী বলেন, “এক বিঘা জমি আবাদ করতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। লোকসান হলেও চাষ করতে হয়, কারণ জমি তো ফাঁকা রাখা যায় না।”

একই এলাকার কৃষক মজিবর রহমান বলেন, “চার বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছি। কিন্তু বর্তমান দামে ধান বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে। কাঁচা ধানের দাম যদি অন্তত ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ হতো, তাহলে কিছুটা হলেও লাভ করা যেত।”

কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, “ধান বিক্রি করে খরচই উঠবে না। তারপরও কৃষকদের আবাদ চালিয়ে যেতে হয়।”

কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে ডিজেল, সেচযন্ত্র, সার ও শ্রমিকের মজুরি বাড়লেও ধানের দাম সেই তুলনায় বাড়েনি। ফলে অনেক কৃষক ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও মৌসুম শেষে ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ছেন। কেউ কেউ আবার বিকল্প ফসল চাষের দিকেও ঝুঁকছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় বোরো চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এবার উপজেলায় মোট ১১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৯ হাজার ৯৩৬ মেট্রিক টন। অনুকূল আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় ধানের শিষ ভালোভাবে পুষ্ট হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও কারিগরি পরামর্শও এ সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে মৌসুমের শেষ দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (কৃষিবিদ) মীর হাসান আল বান্না বলেন, “কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি খাদ্যগুদামে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চালু রয়েছে, যাতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পান।”

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ২০৮ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার প্রতি কেজি ধানের মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। একজন কৃষক সরকারি গুদামে সর্বোচ্চ তিন টন ধান সরবরাহ করতে পারবেন। আগামী ২০ মে থেকে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

জয়পুরহাটের পাঁচবিবির পিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আওলাই ইউনিয়নের পিয়ারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং