জ্বালানি সংকটে স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। অসহনীয় গরমের মধ্যে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা, হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় সৃষ্টি হয়েছে বিঘ্ন এবং শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। ভৈরব দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উপজেলায় প্রায় চার হাজার ছোট-বড় মিল-কারখানা এবং কয়েক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বিদ্যুৎ নির্ভর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শেষ করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শুধু শিল্প খাতই নয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন। এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীর পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, নিয়মিত লোডশেডিং হলেও বিদ্যুৎ বিল কমছে না। বরং মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের অঙ্কের অসামঞ্জস্য থাকায় অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। ভৈরব বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৪৮ হাজার আবাসিক ও ৫ হাজার বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছে। এছাড়া ৭০০টির বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ৪০০টি অটোরিকশা চার্জিং গ্যারেজ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। মিল-কারখানাসহ ভৈরবে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীক মো: শহীদুল্লাহ বলেন: প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে আমার সু ফ্যাক্টরির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষেরও দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। সু ফ্যাক্টরি এবং আইস ফ্যাক্টরির একাধিক মালিক ও ব্যবসায়ী জানান, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ফ্যান, কম্পিউটার, ফ্রিজ, এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান। ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. আ. করিম বলেন, প্রতিদিনই দীর্ঘ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এর কারণে রোগীদের অপারেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র গরমে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। ভৈরব বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান মাহমুদ এলাহী বলেন, ভৈরব পাওয়ার লিমিটেডের (বিপিএল) তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় সেখান থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া সীমিত বিদ্যুৎ দিয়েই চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। এ কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ভৈরব পাওয়ার লিমিটেডের ম্যানেজার নাজমুল হক জানান, বিপিএলের ইউনিটগুলো সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৯০ টন জ্বালানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে আমরা মাত্র ১৫ থেকে ২০ টন জ্বালানি পাচ্ছি। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় তিনটি ইউনিট চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে এবং এর প্রভাব ভৈরবের বিদ্যুৎ সরবরাহে পড়ছে। এদিকে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ ইউনিটগুলো চালু এবং ভৈরবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, শিল্প মালিক ও সাধারণ গ্রাহকরা। তাদের মতে, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে স্থানীয় শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।


