গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে অর্পিত (সরকারি) সম্পত্তি অধিগ্রহণে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ বিতর্ক এবং তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগে আলোচিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন পদোন্নতি ও বদলির আদেশ জারির পরও সাদুল্লাপুরে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়া, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক সাংবাদিক হেনস্তার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বদলির পরও তিনি কেন কর্মস্থল ছাড়েননি, তা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ২০ এপ্রিলের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। একই আদেশে কাউনিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংকন পালকে সাদুল্লাপুরে পদায়ন করা হয়। জনস্বার্থে আদেশটি অবিলম্বে কার্যকরের কথা উল্লেখ থাকলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৪ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তিনি সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পান। ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সাদুল্লাপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত এসিল্যান্ডের দায়িত্বও পালন করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভূমি সেবাপ্রত্যাশীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি খাস জমি, সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ, নামজারি ও ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি ধাপেরহাট ইউনিয়নের হাসানপাড়া মৌজায় সরকারের ১/১ খতিয়ানের অর্পিত ‘ক’ তফসিলভুক্ত সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন দেখিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। একই সম্পত্তি নিয়ে ভূমি প্রশাসনের দুটি পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদনের বিষয়ও প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে তথ্য ও বক্তব্য জানতে গত ১৮ জুন সাদুল্লাপুর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে যান যমুনা টেলিভিশনের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জিল্লুর রহমান পলাশ ও সময় টেলিভিশনের প্রতিবেদক হেদায়েতুল ইসলাম বাবু। সাংবাদিকদের অভিযোগ, এ সময় এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ও অপেশাদার আচরণ করেন, বুম ও ক্যামেরা সরিয়ে দেন এবং কার্যালয় ত্যাগ করতে বলেন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আমলে নেয় বিভাগীয় প্রশাসন। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গত রোববার গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে তদন্ত পরিচালনা করেন রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) মো. আশরাফুল ইসলাম। তদন্তে সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার নথিপত্র, রেকর্ড ও দলিলপত্র পর্যালোচনা করা হয়। ফলে আলোচিত ঘটনাটির বিভিন্ন দিক এখন প্রশাসনিক পর্যালোচনার আওতায় এসেছে।
এদিকে, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে শুধু অর্পিত সম্পত্তি কাণ্ডই নয়, সরকারি খাস জমি, মূল্যবান গাছ ও সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে অবহেলার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, সাদুল্লাপুর মৌজার জেএল নং-৪১-এর বিআরএস ১ নং খতিয়ানভুক্ত ৫৮৯ নং দাগের সরকারি খাস জমি ও মূল্যবান মেহগনি গাছ সংরক্ষণে তার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারি রেকর্ড ও গেজেটভুক্ত নকশায় জমিটির অস্তিত্ব স্পষ্ট থাকলেও গত ২৩ এপ্রিল সরেজমিনে তিনি জমিটি শনাক্ত করা সম্ভব নয় এবং তা “রাস্তায় মিশে গেছে” বা “খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না” বলে মন্তব্য করেন। অথচ তহসিলদার ও তার কার্যালয়ের স্মারক নং-৩০০ ও ৩১১-এর নোটিশে একই জমিতে সরকারি স্বার্থ ও গাছ থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী অবস্থান জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এ ছাড়া জামুডাঙ্গা মৌজার জেএল নং-২২-এর বিআরএস ২৯৬ ও ১৪৪২ খতিয়ানভুক্ত
জমি খাস হিসেবে চিহ্নিতকরণ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এ ঘটনায় কামরুজ্জামান মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত মালিক ও সংশ্লিষ্টদের যথাযথভাবে অবহিত না করেই লাল নিশানা ও সাইনবোর্ড টানানো হয়, যা এলাকায় ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
শুধু তাই নয়, সরকারি ১ নং খতিয়ান, ১/১ খতিয়ান ও ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমি ব্যক্তিগত নামে নামজারির অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি সেবাপ্রত্যাশীদের সঙ্গে অমার্জিত আচরণ, হয়রানি এবং একটি বিশেষ পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। ফলে ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বার্থে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।


