বৃহস্পতিবার,১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

উচ্চশিক্ষার বাতিঘর উখিয়া কলেজ, ৩৫ বছরেও মেলেনি সরকারি মর্যাদা

দক্ষিণ কক্সবাজারের সর্ববৃহৎ ও অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উখিয়া কলেজকে সরকারীকরণের দাবিতে আবারও সোচ্চার হয়ে উঠেছেন উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে সীমান্তবর্তী জনপদের হাজারো শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো সরকারি মর্যাদা লাভ করতে পারেনি। ফলে কলেজটির সরকারীকরণ এখন আর শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দাবি নয়; এটি উখিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, আবেগ এবং ন্যায্য অধিকারের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদ, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের অভিমত—উখিয়া কলেজকে সরকারীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের যোগ্যতা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে। তাই সরকারের উচিত বিষয়টি মানবিক ও বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করে দ্রুত সরকারীকরণের ঘোষণা দেওয়া। তাঁদের মতে, এমন একটি সিদ্ধান্ত সীমান্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করবে।

উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী শাহজাহান চৌধুরীর উদ্যোগে ১৯৯১ সালে প্রায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় উখিয়া কলেজ। সে সময় উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা এবং দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতেন না। এই বাস্তবতা থেকেই সীমান্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষার আওতায় আনার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় উখিয়া কলেজ। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ দক্ষিণ কক্সবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কলেজটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং উখিয়ার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উখিয়া কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক (সাধারণ ও কারিগরি), ডিগ্রি (পাস), বিএম শাখা এবং সাতটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। অনার্স পর্যায়ে বাংলা, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ১০০ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। পাশাপাশি চারটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সীমান্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

উখিয়া কলেজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে কলেজটির সাবেক শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করছেন।

স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষার মান, ফলাফল, শিক্ষার্থী সংখ্যা, অবকাঠামো, একাডেমিক কার্যক্রম এবং সামাজিক অবদানের দিক থেকে উখিয়া কলেজ দীর্ঘদিন ধরেই সরকারীকরণের উপযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কলেজটি এখনো সরকারীকরণের বাইরে রয়ে গেছে। স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনা ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলার কারণেই উখিয়ার সবচেয়ে বড় ও পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সরকারি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তাঁরা উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত উখিয়া বঙ্গমাতা মহিলা কলেজ তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরকারীকরণের আওতায় আসে। যদিও সে সময় সেখানে মূলত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে উখিয়া মহিলা কলেজ রাখা হয়।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, যখন অপেক্ষাকৃত নতুন এবং সীমিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের সুযোগ পেতে পারে, তখন দীর্ঘ ৩৫ বছরের ঐতিহ্য, বিস্তৃত শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিপুল শিক্ষার্থীসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও উখিয়া কলেজ কেন এখনো সরকারীকরণের বাইরে থাকবে?

স্থানীয়দের মতে, প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেওয়ার ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উখিয়ার গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজের প্রয়োজনীয়তাও। শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমানে উখিয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত জনপদ। রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রম, পর্যটন সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উখিয়ার গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আগমনের পর উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চল যখন নজিরবিহীন মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন উখিয়া কলেজও বিভিন্নভাবে মানবিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করে। কলেজের মাঠ ও অবকাঠামো বিভিন্ন জরুরি কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কেবল শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই নয়, সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পরিচয় দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি কলেজ থাকা শুধু প্রয়োজনই নয়, সময়েরও দাবি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উখিয়া কলেজ জাতীয়করণ হলে শিক্ষার্থীরা সরকারি কলেজের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাবে। শিক্ষা ব্যয় কমবে, শিক্ষক সংকট দূর হবে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং নতুন নতুন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানদের জন্য উচ্চশিক্ষা আরও সহজলভ্য হবে। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাবে, ঝরে পড়ার প্রবণতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ ও শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। স্থানীয়দের মতে, একটি কলেজের জাতীয়করণ মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়; বরং হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা, অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং একটি জনপদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।

উখিয়া কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শাহা আলম বলেন, “১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত শাহজাহান চৌধুরীর স্বপ্নের উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি। আমাদের পরে প্রতিষ্ঠিত অনেক কলেজ বিগত সরকারের আমলে জাতীয়করণ হলেও এই পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী কলেজটি এখনো সরকারি হয়নি। এতে এখানকার শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সরকারের কাছে জোরালোভাবে দাবি জানাচ্ছি, উখিয়া কলেজকে দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক। এই কলেজটি সরকারি হলে সীমান্ত এলাকার অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার আরও বড় সুযোগ পাবে এবং দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।”

উখিয়া ও টেকনাফ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলের উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, বেকারত্ব হ্রাস এবং একটি দক্ষ ও শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে উখিয়া কলেজের জাতীয়করণকে অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আজও প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় নতুন নতুন স্বপ্নের জন্ম হয়। এখান থেকেই অনেক শিক্ষার্থী ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক হওয়ার স্বপ্ন বুনে। বহু দরিদ্র পরিবারের সন্তান সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও এই কলেজকে কেন্দ্র করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

উখিয়াবাসীর প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দাবি ও জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার দ্রুত উখিয়া কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় আনবে। কারণ একটি কলেজের জাতীয়করণ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি একটি অঞ্চলের শিক্ষা, উন্নয়ন, মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আর সেই কারণেই ৩৫ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাওয়া উখিয়া কলেজের জাতীয়করণ আজ উখিয়াবাসীর প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

ধর্মপাশায় ৭ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ থাকলেও ১ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা দেখেন ১১০ প্রাথমিক বিদ্যালয়

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা একটি হাওর বেষ্টিত উপজেলা।যা আয়তনের দিকে অনেক