৪৭তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে চা বাগানের সন্তান মনোজ কুমার যাদব

মৌলভীবাজার জেলার চা বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলের এক শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে এসে সম্প্রতি তিনি ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁর এই অর্জনে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার চা বাগান এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে আনন্দ, গর্ব ও অনুপ্রেরণার আবহ।
এর আগে তিনি সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, চা বাগান এলাকায় অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনার বিষয় হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে প্রশংসিত হন।
মনোজ কুমার যাদবের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার চাম্পারায় চা বাগানে। সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও অধ্যবসায়, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর এই সাফল্য চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
মনোজ কুমার যাদব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে ২০২২ সালে অনার্স এবং ২০২৩ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। উভয় ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি মেধা ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছেন বলে জানান তাঁর সহপাঠী ও শিক্ষকরা।
মনোজের বাবা ধনঞ্জয় যাদব ন্যাশনাল টি কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত টিলা ক্লার্ক। তিনি ২০১৬ সালে দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবন শেষে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ইউনিট রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ‘বিবেকানন্দ প্রান্তিক শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন।
মনোজের মা দেওন্তি রানী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ভাড়াউড়া চা বাগানের মন্দিরভিত্তিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষার প্রতি পারিবারিক আগ্রহ ও সচেতনতা মনোজের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানান স্থানীয়রা।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে মনোজ একমাত্র ছেলে। তাঁর বড় বোন দেবকী রানী যাদব অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে ল্যাব সহকারী হিসেবে কর্মরত। ছোট বোন দেবশ্রী যাদব ফুল স্কলারশিপ নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি), বর্ধমান থেকে ২০২৫ সালে বায়োটেকনোলজিতে অনার্স (বি.টেক) ডিগ্রি কৃতিত্বের সঙ্গে অর্জন করেছেন।
মনোজের দাদী প্রভারতী গোয়ালা চাম্পারায় চা বাগান হাসপাতালে ড্রেসার হিসেবে কর্মরত। তাঁর দাদা প্রয়াত তারা প্রসাদ গোয়ালা একই হাসপাতালে ড্রেসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। শ্রম, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার ঐতিহ্য এই পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে প্রবহমান।
মনোজের বাবা ধনঞ্জয় যাদব এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“ছেলের এই সাফল্য আমাদের পরিবারের নয়, পুরো চা শ্রমিক সমাজের অর্জন। অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে সে এগিয়েছে। আজ তার ফল পাওয়া গেল।”
৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় মনোজ কুমার যাদবকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।
তিনি বলেন, “চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মনোজের এই অর্জন অত্যন্ত গর্বের। এটি প্রমাণ করে, মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সক্ষম।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা মনে করেন, মনোজ কুমার যাদবের এই সাফল্য চা শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়াবে এবং আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ভবিষ্যতে তিনি দেশ ও সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।
Inception : A Platform of Medical & University Tea Students — এর সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক পেইজে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছে, “মনোজ কুমার যাদব, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার চাম্পারায় চা বাগানের মেধাবী মুখ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “সমাজকল্যাণ ও গবেষণা” বিষয়ে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।
সম্প্রতি তিনি ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন- যা নিঃসন্দেহে তাঁর কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অগ্রযাত্রায় তিনি এক অনুকরণীয় উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাঁর এই অর্জন চা বাগানের তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও এবং  রাষ্ট্রসেবার প্রতি নতুন আস্থা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
Inception: A Platform of Medical & University Tea Students পরিবার তাঁর এই গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে উনার মূল্যবান অবদান কামনা করছে।
আমরা মনোজ কুমার যাদবের  উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও সফলতা কামনা করি।”

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

লালমনিরহাটে মানবিক কার্যক্রমকে আরও বেগবান করার অঙ্গীকার: নতুন কমিটির মমিনুল, লায়লা ও রোজি

​বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, লালমনিরহাট ইউনিটের কার্যনির্বাহী কমিটি (২০২৫–২০২৭)-এর নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নবনির্বাচিত এ কমিটিতে চেয়ারম্যান পদে এ কে এম মমিনুল হক, ভাইস চেয়ারম্যান পদে লায়লা হাবিব এবং সেক্রেটারি পদে অ্যাডভোকেট জিন্নাত ফেরদৌস আরা রোজি নির্বাচিত হয়েছেন।   ​এছাড়া কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেছেন-আফজাল হোসেন, মজমুল হোসেন প্রামানিক, আবুল বাশার, আজিজুল ইসলাম ইউলাদ, হ.শ.ম জয়নুল আবেদীন স্বপন, রোকনুজ্জামান রোকন, এবি.এম ফেরদৌস এবং সাহেদুল ইসলাম পাটোয়ারী।   ​দায়িত্ব গ্রহণের পর এক প্রতিক্রিয়ায় নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান এ কে এম মমিনুল হক বলেন, “রেড ক্রিসেন্ট একটি আন্তর্জাতিক মানবিক প্রতিষ্ঠান। লালমনিরহাটের প্রান্তিক, দুস্থ ও অসহায় মানুষের প্রতিটি সংকটে পাশে দাঁড়ানোই হবে আমাদের নতুন কমিটির প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা আগামী দিনগুলোতে জেলার দুর্যোগকালীন জরুরি সহায়তা জোরদার করা, বিনামূল্যে রক্তদান কর্মসূচি বিস্তৃত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তরুণ ও যুবদের স্বেচ্ছাসেবী কাজে উৎসাহিত করে লালমনিরহাটে রেড ক্রিসেন্টের প্রতিটি কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, গতিশীল ও গণমুখী করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”   ​সংগঠনকে সুসংগঠিত ও নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করে নবনির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান লায়লা হাবিব বলেন, “রেড ক্রিসেন্টের সেবা কার্যক্রমকে প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দ্বারে পৌঁছে দিতে আমরা দলমত নির্বিশেষে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে যেকোনো দুর্যোগে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে এবং নারী স্বেচ্ছাসেবক তৈরিতে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লালমনিরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটকে একটি আদর্শ মানবিক সেবাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”   ​কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত ও কার্যকর করার অঙ্গীকার জানিয়ে নবনির্বাচিত সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট জিন্নাত ফেরদৌস আরা রোজি বলেন, “আমাদের মূল শক্তি হলো তরুণ ও যুব স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণ সমাজকে মানবসেবায় যুক্ত করা হবে। শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে প্রতিটি মানবিক প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাব। যেকোনো সংকটে লালমনিরহাটের মানুষের বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে রেড ক্রিসেন্ট কাজ করে যাবে।”  

লালমনিরহাটে আধুনিক পদ্ধতির সবজি চাষে ঝুকছেন কৃষক

জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় কৃষিতে মালচিং পেপার ব্যবহার করে চাষ হচ্ছে নানা রকম আগাম ও মৌসুমি জাতের সবজি।   সনাতন পদ্ধতির পাশা পাশি আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন কৃষকেরা,জমিতে মালচিং পেপার, জৈব সার,মাটির গুনাগুন পরিক্ষা করে পরিমান মতো রাসায়নিক সার ব্যবহার এমনকি লতাজাতিয় সবজি চাষের জন্য মাচা তৈরিতে নেট ও কট সুতার ব্যবহারও করা হচ্ছে। লালমনিরহাটের আদিতমারী  উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষাবাদ শুরু করেছেন কৃষকেরা, মুলত অতিবৃষ্টি ও রোদের কারনে যখন আশানুরূপ সবজি উৎপাদনে বাধা গ্রস্থ হচ্ছে ঠিক তখনি কৃষকরা এ পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। এছাড়াও মালচিং পেপার ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল ফলালে জমিতে সার প্রয়োগ ও কীটনাশক স্প্রে সহজ ভাবে করা যায়,সেই দিক থেকেও এ পদ্ধতি ব্যাপক সারা ফেলেছে,জমিতে এই পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করলে সেচ দিতে সুবিধা হয় অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করতে হয় না এবং ফলনও বেশি হয় বলে জানিয়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা।   সাধারন পদ্ধতির চেয়ে মালচিং পেপার ব্যবহার করে আধুনিক পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা অনেক সহজ এ পদ্ধতিতে লেবার ব্যায় সহ অন্যন্য ব্যায় অনেক কম হয়। অতিমাত্রার রোদ বৃষ্টির কারনে সহজে ফসল নষ্ট হয় না এমনকি জমিতে পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়।   লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ মতিউল আলম বলেন,কৃষিতে মালচিং ব্যবহার একটি ভাল দিক এ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করলে ফসলের রোগবালাই কম হয় জমিতে দেওয়া সার নষ্ট হয় না এবং ভাল ফলন আশা করা যায়।