আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। ১৯৪৬ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তবে এবারের জন্মদিনটি ভিন্ন আবহে পালিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ৭৯ ও ৮০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী স্বল্প সময়ের সরকারও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
রাজনীতিতে প্রবেশ
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক সংকটে পড়া বিএনপির নেতৃত্বে ধীরে ধীরে উঠে আসেন তিনি।
১৯৮২ সালে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতায় পরিণত করে।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরশাদের পদত্যাগের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় খালেদা জিয়া
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাঁর প্রথম মেয়াদে শিক্ষা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক নীতিতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষায় বিভিন্ন সুবিধা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি এবং ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচি সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে ছিল।
এ সময় যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাত সম্প্রসারণে নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং খালেদা জিয়া সার্কের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া আবার প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি, প্রবাসী আয়, যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিভিন্ন অগ্রগতি ঘটে। একই সময়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনাও ছিল।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিরোধ
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে সরকার ও বিরোধী দলের নেতৃত্বে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তাঁর নেতৃত্বের সময় যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপির শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, তেমনি রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, অবরোধ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক বিরোধও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র আকার ধারণ করে।
ফলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়নে তাঁর সমর্থকদের প্রশংসার পাশাপাশি বিরোধীদের সমালোচনাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেষ জীবনের রাজনৈতিক অধ্যায়
২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ও পরে গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁর চিকিৎসা ও বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়।
২০২৫ সালের শেষ দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ভোরে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁর জানাজা ও দাফনে অংশ নেন।
উত্তরাধিকার ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত রাখেন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিএনপির আসনসংখ্যা ২১১-২১২-এর কাছাকাছি উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
ফলে খালেদা জিয়ার এবারের জন্মদিন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক অবদান স্মরণের দিন নয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ প্রভাব এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বর্তমান পর্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনার উপলক্ষ।
বাংলাদেশের প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতি, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব—এসবই তাঁকে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত করেছে।
তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক। আর রাজনৈতিক ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে তিনি ছিলেন এমন এক নেত্রী, যাঁর রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।


