প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 1, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Nov 20, 2025 ইং
দৃষ্টিহীন গোলাপ বিশ্বাস,ডিম-বাদাম বিক্রি করে চলছে জীবনের লড়াই

মোঃ হামজা শেখ
মাত্র ছয় বছর বয়সে কালাজ্বরে (ভিসারাল লেইশম্যানিয়াসিস) আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান গোলাপ বিশ্বাস (৩৭)। সেই বয়স থেকেই অন্ধকার নেমে আসে তার জীবনে। কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। অভাব, অন্ধত্ব ও কঠিন বাস্তবতা—সব বাধা ডিঙিয়ে নিজের সম্মানে বাঁচার পথটাই বেছে নিয়েছেন তিনি।
রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের বিলমানুষমারি গ্রামের দিনমজুর নায়েব বিশ্বাসের বড় ছেলে গোলাপ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বড় হওয়ায় সংসারের দায়িত্বও বেশি পড়েছে তার কাঁধে। বাবা নায়েব বিশ্বাস দিনমজুর, মা ভানু বেগম বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না আগের মতো। ছোটবেলাতেই সংসারের কষ্ট দেখতে দেখতে বড় হয়েছেন তিনি।
১৬ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল গোলাপের। কিন্তু ছেলে আলামিন জন্মানোর মাত্র ১৮ দিন পরই স্ত্রী প্যারালাইজড হয়ে চলে যান বাবার বাড়ি। সেখানেই থেমে যায় আরেকটি আশার গল্প। তবে থেমে যাননি গোলাপ। ছেলেকে কোলে নিয়ে একাই শুরু করেন বাঁচার সংগ্রাম। আজ তার ছেলে আলামিন (১৫) স্থানীয় মাদরাসায় নবম শ্রেণিতে পড়ছে।
চোখে দেখতে না পেলেও গত দেড় বছর ধরে মদাপুর বাজারে নিজের স্বাবলম্বী পথ তৈরি করেছেন গোলাপ। প্রতিদিন ভরসা করে হাঁটতে হাঁটতে বাজারে যান তিনি। কখনো দোকানে দোকানে ঘুরে, কখনো চায়ের দোকানের পাশে বসে সিদ্ধ হাঁসের ডিম ও বাদাম বিক্রি করেন। দিনের শেষে যা আয় হয়, তাতেই চলে তিন সদস্যের সংসার।
গোলাপ বিশ্বাস বলেন,চোখে আলো নাই—এটাই আমার নিয়তি। কিন্তু ভিক্ষা করে চলতে লজ্জা লাগে। নিজের হাতে কাজ করে সংসার চালাতে পারাটাই আমার গর্ব।
গোলাপের মা ভানু বেগম আরও বলেন,
আমার বড় ছেলেটা অনেক কষ্ট করে। অন্যের কাছে হাত পাতে না। আপনাদের মতো মানুষেরা যদি পাশে থাকেন, ওর কষ্ট একটু হলেও কমবে।
স্থানীয়দের মতে, গোলাপ কেবল একজন দৃষ্টিহীন মানুষ নন—তিনি আত্মসম্মান, সাহস আর পরিশ্রমের এক জীবন্ত উদাহরণ। চোখের দৃষ্টি না থাকলেও তার দৃঢ় মনোবলই তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনে।
কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহুয়া আফরোজ জানান, গোলাপ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়া সত্ত্বেও ভিক্ষা করেন না।বরং নিজেই আয় করে সংসার চালায়, এটা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। যেহেতু সে নিজেই কিছু একটা করছে,কালুখালী উপজেলা প্রশাসন তার সাথে কথা বলে তার জন্য ভালো কিছু একটা করে দেওয়া যায় সেই লক্ষে কাজ করবে।
চোখের আলো কেড়ে নেওয়া অন্ধকারও থামাতে পারেনি গোলাপের পথচলা। স্থানীয়দের বিশ্বাস, অল্প সহায়তাও বদলে দিতে পারে এই সংগ্রামী মানুষের জীবন।
স্বত্ব © দৈনিক জনতার খবর ২০২৫ | ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।