
মোঃ মশিউর রহমান
দিনাজপুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক ছাড় ও অবাস্তব মুনাফার লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘সাকসেস ভিশন ডিস্ট্রিবিউশন হাউস’-এর বিরুদ্ধে। হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা উধাও হয়ে যাওয়ার পর শতাধিক ভুক্তভোগী বুধবার (১৯ নভেম্বর) সকালে দিনাজপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ফেটে পড়েন কান্নায় ও ক্ষোভে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির তথাকথিত পরিচালক মো. রাকাত আলী (প্রিন্স/পলাশ) ও তার সহযোগী মাহাবুব এবং মোস্তফা কামাল আপন দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন চটকদার অফার দেখিয়ে টাকা সংগ্রহ করে। গত ১৬ নভেম্বর হঠাৎ করে তারা অফিস গুটিয়ে পালিয়ে গেলে প্রকাশ পায় চরম প্রতারণার চিত্র।
অস্বাভাবিক অফারের ঝাঁকে ফাঁদে ফেলা হয় মানুষকে
প্রায় এক বছর আগে চারুবাবুর মোড়ের ডাচ-বাংলা ব্যাংকের তৃতীয় তলায় অফিস খুলে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করে তাদের কার্যক্রম। মানুষকে আকর্ষণ করতে তারা ছড়ায় একের পর এক অবাস্তব অফার—
৩ হাজার টাকায় সদস্য হলে ৫ লিটার সয়াবিন তেল ও প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা লভ্যাংশ,
১ লাখ বিনিয়োগে মাসে ৩৫ হাজার টাকা,
৫ লাখে মাসে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা,
এক বস্তা চাল কিনলে এক বস্তা চাল ফ্রি,
ডিলারশিপের নামে মোটা অঙ্কের টাকা গ্রহণ।
সহজে ধনী হওয়ার স্বপ্নে ভর করে বহু মানুষ তাদের সঞ্চয়, ধারদেনা কিংবা পারিবারিক সম্পদ বিক্রি করে বিনিয়োগ করেন প্রতিষ্ঠানটিতে।
প্রেসক্লাবে ভুক্তভোগীদের করুণ আর্তনাদ
সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
শাহীনুর বেগম বলেন,
“লোভ দেখিয়ে আমার ও পরিবারের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছে। এখন অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখছি না।”
লাবনী রাণী রায় জানান,
“ডিলারশিপের নামে ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। এখন সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে গেছে।”
মিনু রানী রায় বলেন,
“এক বস্তা চাল কিনলে এক বস্তা ফ্রি—এই কথা শুনে কয়েক লাখ টাকা দিয়েছিলাম। আজ মনে হয় সবচেয়ে বড় ভুল করেছি।”
জকিয়া সুলতানা অভিযোগ করেন,
“নার্সারির বাচ্চাদের ভর্তি করানো ও সদস্য করার নামে ৮৮ হাজার টাকা নিয়েছে। এখন টাকা কোথায় গেল তার হদিস নেই।”
অভিযোগে আরও উঠে আসে—অনেক নারী পরিবারের অজান্তে টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন প্রতারণা প্রকাশ পাওয়ায় চরম মানসিক চাপ, লজ্জা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা। কেউ কেউ বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
আইনি সহায়তা না পেয়ে ক্ষোভ আরও তীব্র
ভুক্তভোগীরা জানান, থানায় অভিযোগ করেও মামলা রুজু হয়নি। কোতোয়ালি থানার ওসি তাদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ আরও বাড়ছে। তারা মনে করছেন—আইনের পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে প্রতারণা চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন—মোছাঃ রজিয়া বেগম, হুসনে আরা বিউটি, শাহীনুর আরা, মিনু রানী রায়, লাবণ্য রাণী রায়, রিপন আলীসহ অসংখ্য ভুক্তভোগী।
শেষ আহ্বান—“আমাদের টাকা ফিরিয়ে দিন, প্রতারকদের শাস্তি চাই”
প্রেসক্লাবে উপস্থিত শতাধিক মানুষ এক সুরে দাবি জানান—
“আমাদের কষ্টার্জিত টাকা ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রতারকচক্রকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যেন আর কোনো পরিবার পথে না বসে।”