
মোঃ মশিউর রহমান
প্রভাতের সূর্য যখন আলতো করে আলো ছড়াচ্ছিল দাগলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে একটি বিশেষ দিন—একটি বিদায়ের দিন, যেদিন ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর স্মৃতিরা হাত ধরে দাঁড়াবে একজন মানুষকে কেন্দ্র করে। সেই মানুষটি—রাজকুমার দাস।
চার দশকের অধিক সময় ধরে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতার প্রদীপ জ্বালিয়ে যাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী, সেই প্রিয় শিক্ষক আজ অবসর নিলেন।
বিদ্যালয়জুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা—যেনো সময় দাঁড়িয়ে গেছে
সকালের শীতল বাতাসে যখন বিদ্যালয়ের গেটে ভিড় জমতে লাগল, মনে হচ্ছিল কেউ একজন নিজের জীবনের চিত্রনাট্য শেষ অধ্যায়ে এসে থেমে দাঁড়িয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের হাতে গোলাপ, সাবেক ছাত্রদের চোখে স্মৃতির কুয়াশা, সহকর্মীদের মাঝে নিঃশব্দ অভিমান—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হলো এক অচেনা আবহ।
দাগলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি বেঞ্চ, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ যেন আজ বলছে—
“এই মানুষটিই আমাদের প্রাণ, আমাদের ইতিহাস।”
বক্তারা বললেন—রাজকুমার দাস শুধু শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন জীবনের দিশারী
একজনের পর একজন বক্তা যখন মঞ্চে উঠলেন, তাঁদের কথায় ফুটে উঠল রাজকুমার দাসের কর্মময় জীবনের মহিমা।
কেউ বললেন—
“তিনি শুধু ক্লাস নেননি; তিনি চরিত্র গড়েছেন।”
আবার কেউ বললেন—
“শিক্ষার্থীর ভুল দেখলে বকতেন, কিন্তু সেই বকুনি ছিল শাসনের ছদ্মবেশে মমতা।”
সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন একজন ব্যক্তির প্রশংসা করতে গিয়ে অনেকেই বাকরুদ্ধ হয়ে যান—কারণ তাঁর সম্পর্কে বলার মতো ভালোবাসার শব্দ কখনোই যথেষ্ট ছিল না।বিদায়যাত্রা—ঘোড়ার গাড়িতে বসে এক সময়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ভেসে গেলেন স্মৃতির পথে
অনুষ্ঠানের শেষে যখন সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িটি বিদ্যালয়ের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন মুহূর্তটি যেন ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেওয়ার মতো এক মহৎ দৃশ্য হয়ে উঠল।
রাজকুমার দাস গাড়িতে উঠতেই শিক্ষার্থীরা দুই পাশে সার বেঁধে দাঁড়াল।
কারও হাতে ফুল, কারও চোখে জল, আর কারও কণ্ঠে ভেসে এল—
“স্যার, আপনাকে ছাড়া স্কুলটা কেমন হবে?”
ঘোড়ার গাড়িটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে লাগল।
মনে হচ্ছিল এই পথে শুধু একটি গাড়ি নয়—যাচ্ছে এক যুগ, এক প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
শিক্ষার্থীদের অশ্রুসিক্ত কণ্ঠ—যেনো সবার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গান
এক শিক্ষার্থী কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“স্যার ছিলেন আমাদের অন্ধকারে আলো দেখানোর মানুষ। তাঁর মুখের হাসি আজও মনে থাকবে।”
আরেকজন সাবেক ছাত্র বলল—
“যদি জীবনে কোনো সাফল্য পাই, স্যারের শাসন আর ভালোবাসাই আমার প্রথম পুঁজি।”
শিক্ষকের বিদায় যেন শিক্ষার্থীদের শৈশবের শেষ পাতা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো এক ব্যথা।
শেষ বক্তব্যে রাজকুমার দাস বললেন—“আমি কিছুই দিইনি, পেয়েছি অনেক”
শেষ মুহূর্তে তিনি মাইকে দাঁড়িয়ে চোখ মুছে বললেন—
“দাগলাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কেবল কর্মস্থল নয়—এ আমার পরিবার। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাই আমার জীবনের সর্বোচ্চ পুরস্কার।”
তাঁর কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ ছিল না—ছিল পূর্ণতা, ছিল তৃপ্তি।
একজন শিক্ষক চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন আলো
রাজকুমার দাস ১৯৮২ সালে এখান থেকে এসএসসি পাস করেন এবং পরে নিজের প্রিয় এই বিদ্যালয়েই ১৯৯২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষকতা শুরু করেন।
আজ সেই দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তি হলেও তাঁর শিক্ষা, তাঁর মানবতা, তাঁর কোমল হাসি—রবে দাগলাগঞ্জের বাতাসে চিরদিন।
তিনি আর শ্রেণিকক্ষে দাঁড়াবেন না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের ধ্বনি, তাঁর শাসনের স্নেহ, তাঁর নৈতিকতার শিক্ষা—যুগ থেকে যুগান্তরে বয়ে চলবে।