
দয়াল বড়ুয়া।।
বাংলাদেশের বৌদ্ধ ইতিহাস একটি প্রাচীন, গৌরবময় ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অধ্যায়। এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের সূচনা প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, এবং এটি বহু শতাব্দী ধরে ধর্ম, শিক্ষা, শিল্প ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
বাংলাদেশের বৌদ্ধ ইতিহাস: সংক্ষিপ্ত বিবরণ-
১. প্রাচীন যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ – খ্রিষ্টীয় ৫ম শতক)
গৌতম বুদ্ধ (৫৬৩–৪৮৩ খ্রিঃপূঃ) এর সময়েই বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম হয়।
তখনকার বাংলার অংশ ছিল মগধ রাজ্য, যেখানে বুদ্ধ ঘুরে বেড়িয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে (বিশেষত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার) প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা শুরু হয়।
২. মৌর্য ও গুপ্ত যুগ (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতক – খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতক)
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতক) বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেন।
তাঁর দূতেরা বঙ্গেও ধর্ম প্রচার করেন বলে বৌদ্ধ ইতিহাসবিদেরা মনে করেন।
৩. পাল রাজবংশ (৮ম – ১২শ শতক): বৌদ্ধ ধর্মের স্বর্ণযুগ
গোপাল, ধর্মপাল ও দেবপাল ছিলেন বৌদ্ধধর্মের মহান পৃষ্ঠপোষক। এ সময় নির্মিত হয় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ বিহার,সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর,মহাস্থানগড়, ময়নামতি (কুমিল্লা)-তেও বহু বিহার ও স্তূপ নির্মিত হয়।
পাল যুগেই মহায়ান ও বজ্রযান ধারার বিকাশ ঘটে।
৪. সেন যুগ ও মুসলিম শাসন (১২শ শতক–১৮শ শতক):
বৌদ্ধ ধর্মের ধ্বংস হয় এবং সেন রাজবংশ (হিন্দু) ক্ষমতায় এলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করে।
মুসলিম শাসনের সময়েও বৌদ্ধরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
তবে দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা (চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম) বৌদ্ধ ধর্মের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে।
৫. ব্রিটিশ ও আধুনিক যুগ (১৮শ–বর্তমান):
পুনর্জাগরণ ও টিকে থাকা
ব্রিটিশ শাসনে কিছুটা ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরে আসে।
উনবিংশ ও বিংশ শতকে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে:
বৌদ্ধ সমাজ গঠিত হয়,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিহার ও ধ্যানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়
বাংলাদেশের বর্তমান বৌদ্ধ সম্প্রদায়
মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.৫% বৌদ্ধ (প্রায় ১০–১২ লক্ষ)
প্রধানত বসবাস করেন:
চট্টগ্রাম,কক্সবাজার,পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি)
অনেকেই থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করেন।
উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠী: বড়ুয়া, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন ইত্যাদি।
বাংলাদেশের বৌদ্ধ ইতিহাস ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যিক দিক থেকে অসাধারণ। যদিও বর্তমানে এটি সংখ্যালঘু ধর্ম, তবে এর ঐতিহ্য আজও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তথ্য সংগ্রহে- প্রজ্ঞামিত্র প্রকাশনা পরিষদ।