
মোঃ শরিফুল ইসলাম।।
সিরাজগঞ্জের উত্তর জনপদের যমুনা নদী বেষ্টিত কাজিপুর উপজেলা। এই উপজেলায় ১২টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা এবং সিরাজগঞ্জ সদরের ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে সিরাজগঞ্জ-১ সংসদীয় আসন গঠিত। ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল এ আসনে নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারেনি। একই পরিবার বারবার নির্বাচিত হওয়ায় পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি কাজিপুরে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ কাজিপুরবাসী। বিরোধীমত দমনে আওয়ামী লীগ ও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন কাজিপুরে এক ধরনের দুর্গ তৈরি করেছিল। তাদের ভয়ভীতি, হুমকি-ধামকিতে সাধারণ মানুষ অনেকটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল।
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ, গুম, খুন, ধর্ষণ ও মাদকের মত অপরাধ মহামারির মতো কাজিপুরে ছড়িয়ে পড়ে। যে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই তাকে নিপীড়ন, হামলা, মিথ্যা মামলা ও সামাজিকভাবে একঘরে করার মত নির্যাতনের শিকার হতে হতো। জনজীবন হয়ে পড়ে বাকস্বাধীনতাহীন, নিরাপত্তাহীন ও অবরুদ্ধ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের সকল কুকর্মের তথ্য প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ বলছে, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সামাজিক বিচার সালিস, ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট ও যানবাহনে অবৈধ চাঁদাবাজি চালিয়েছে। নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে বহু ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট ধ্বংস করেছে এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটিয়েছে। নিয়োগে মেধাবীদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে অবাধে নিয়োগ বাণিজ্য করেছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে গুম, মামলা, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ধর্ষণের বিচার চাইলে ভুক্তভোগীকে উল্টো হেনস্থা করা হতো।
সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো হয়েছে দমন-পীড়নের স্টিম রোলার। এতদিন কেউ ভয়ে কিছু বলতে পারেনি। বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর কাজিপুরে যেন আনন্দের বন্যা বইছে। বন্দিত্বের শৃঙ্খল ছিন্ন করে মানুষ স্বাধীনভাবে নিশ্বাস নিতে পারছে। তারপরও মানুষের মনে আওয়ামী লীগের ভয়াবহ দুঃশাসনের স্মৃতি এখনো জ্বলন্ত।
উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব দিনরাত পরিশ্রম করে জনমনে ভয়ভীতি দূর করতে কাজ করছে। তাদের বক্তব্য—কাজিপুরের মাটিতে আর কোনো দিন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, নিয়োগ বাণিজ্য, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধের স্থান হবে না, ইনশাআল্লাহ। কেউ এসব কুকর্মের সঙ্গে জড়িত হলে, তাকে শক্ত হাতে দমন করা হবে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সংগ্রামী সভাপতি ও মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী জননেতা সেলিম রেজা বলেন, "আমরা কাজিপুরকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব, নিয়োগ বাণিজ্য, গুম, খুন ও ধর্ষণমুক্ত ঘোষণা করেছি। সবাই স্বাধীনভাবে চলাফেরা, মতপ্রকাশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, যানবাহন পরিচালনা করতে পারবেন। কাউকে কোনো চাঁদা দিতে হবে না। কেউ দলের নামে চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্ব করতে এলে তাকে জনসমক্ষে ধরে আমাদের হাতে সোপর্দ করুন।"
তিনি আরও বলেন, "বিএনপি জনগণের দল, জনগণের সাথেই ছিল, আছে এবং থাকবে। সন্ত্রাসীদের কাজিপুরের মাটিতে কোনো স্থান হবে না ইনশাআল্লাহ। কাজিপুরকে আমরা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করব। বিগত দিনে যারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তারা শাস্তি পাবেই।"
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক আব্দুস সালাম বলেন, "আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কাজিপুরকে দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল না। বিচার সালিসেও ঘুষ বাণিজ্য হতো। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসীরা মিছিল-মহড়া চালিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাতো। মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে দিয়ে সমাজ ধ্বংস করত। যারা প্রতিবাদ করত, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হতো। এখন আমরা কাজিপুরকে দলীয় প্রভাবমুক্ত স্বাধীন উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করছি।"
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী মিজানুর রহমান বাবলু বলেন, "আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আগ্রাসী মনোভাবের কারণে কাজিপুরবাসী দীর্ঘদিন বাকস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিল। সাধারণ মানুষ ন্যায্য অধিকার ও বিচার পায়নি। দলীয়করণ করে বিচার সালিস পরিচালনা করত। এখন থেকে আমরা কাজিপুরে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড হতে দেব না। কাজিপুর কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়—এটি জনগণের। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এলে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ।"
তিনি আরও বলেন, "আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ কাজিপুরকে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করত। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে অপমান, হেনস্থা, নির্যাতন করত। তরুণদের জন্য ছিল না বাকস্বাধীনতা, ছিল না ভোটাধিকার। চাকরিতে মেধাবীদের বাদ দিয়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ দেওয়া হতো। প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলা দেওয়া হতো। গ্রামে গ্রামে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নামে সন্ত্রাসী আখড়া গড়ে উঠেছিল।"
তিনি আরও বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আজ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই দুঃশাসনের শৃঙ্খল ভেঙে গেছে। আমাদের বড় প্রাপ্তি হলো—আমরা মুক্ত হয়েছি। এখন তরুণ, নবীন, প্রবীণ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ভীতিহীন, বিশৃঙ্খলামুক্ত, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পরিচ্ছন্ন কাজিপুর গড়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। ইনশাআল্লাহ, আমরা সবাই মিলে একটি নিরাপদ, অসাম্প্রদায়িক, পরিচ্ছন্ন, শান্তিপূর্ণ কাজিপুর গড়ে তুলব।"