
মোঃ শাহ্ আলম।।
ময়মনসিংহ ও শেরপুর সীমান্তবর্তী রাংটিয়া, মধুটিলা ও গজনী এলাকায় কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই লোকালয়ে নেমে আসছে বন্য হাতির পাল। মুহূর্তেই ধান, কলা, শাকসবজি ও আখের মতো রবিশস্য লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। শুধু ফসল নয়, হাতির আক্রমণে বসতবাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে এবং কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
কৃষকের আর্তনাদ
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন,
“সারা বছর খেটে যে ধান ফলালাম, এক রাতেই হাতির পাল নষ্ট করে দিলো। এখন আর পরিবারকে চালানোর উপায় নেই।”
মধুটিলা এলাকার কৃষক রহিম মিয়া বলেন,
“প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকি। ফসল হারানোর ভয়, আবার ঘরবাড়ি ভাঙার ভয়ে আমরা ঘুমাতেও পারি না।”
গজনী গ্রামের কৃষাণী হালিমা খাতুন জানান,
“সরকারি সহায়তা একেবারেই নেই বললেই চলে। অথচ আমাদের সরিষা, শাকসবজি, ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিপূরণ না পেলে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে।”
বন বিভাগের বক্তব্য
শেরপুর বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“বনভূমি কমে যাওয়ায় হাতির খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছে। হাতির প্রাকৃতিক করিডরগুলোও মানুষের বসতি ও কৃষিজমি দখলে চলে গেছে। তাই তারা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে।”
তিনি আরও বলেন,
“আমরা ইতিমধ্যেই স্থানীয়দের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। কমিউনিটি প্যাট্রোল টিম গঠন, সোলার ফেন্সিং, হাতির করিডর চিহ্নিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব বাস্তবায়নে সময় ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞ মতামত
প্রকৃতি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে—
বনভূমি ধ্বংস এবং চাষাবাদ বিস্তারের কারণে হাতি তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে।
হাতি হত্যা কোনো সমাধান নয়। বরং টেকসই সমাধান হলো তাদের জন্য আলাদা হাতি করিডর ও খাদ্য সংস্থান তৈরি করা।
কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে নিয়মিত সরকারি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষতির চিত্র
ধান, সরিষা, শাকসবজি ও কাকরোল ও সিম ক্ষেত লণ্ডভণ্ড
কৃষকের আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা
বসতবাড়ি ভাঙচুর ও মাটির দালান ভেঙে ফেলে
প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে
গ্রামবাসীর রাতভর পাহারা দেয়
সমাধানের পথ
১. কমিউনিটি পাহারা দল গঠন
২. মরিচ-তামাকের ধোঁয়া, মৌচাক ও শব্দ ব্যবহার
৩. সোলার ফেন্সিং ও সেন্সর লাইট
৪. হাতির করিডর পুনর্গঠন
৫. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকর
রাংটিয়া, মধুটিলা ও গজনী অঞ্চলের কৃষকরা আজ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে বন্য হাতির আক্রমণ, অন্যদিকে সরকারি সহায়তার ঘাটতি—সব মিলিয়ে তারা দিশেহারা।
বন বিভাগের দাবি, তারা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে স্থানীয়দের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবন দুই-ই মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে।
সংঘাত নয়, সহাবস্থান—এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।