মো:মিজানুর রহমান শাহীন
ইউনিয়ন পরিষদের চত্বর ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সারি সারি গরু-ছাগল। ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় আর অসহনীয় হাঁকডাকে মুখর পুরো এলাকা। এর পাশেই নামেমাত্র চলছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান। হাট বসার দিন বিদ্যালয়ে পাঠদান পরিচালনা ও ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সেবা দেওয়ার ন্যূনতম পরিবেশও থাকে না।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নে ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বুধবার ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর ও আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়মিত গরু-ছাগলের হাট বসছে। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ।
এদিকে নিকলী–বাজিতপুর আঞ্চলিক সড়ক ঘেঁষে অবস্থিত সাজনপুর গরুর হাটে প্রবেশের জন্য সড়কের দু’পাশে গরু-ছাগলবাহী ট্রাক ও পিকআপ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ফলে সড়কে স্বাভাবিক যান চলাচল বিঘ্নত হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, জারইতলা ইউনিয়নের গোপী রায়ের বাজারের নামে প্রায় ৩৬ শতাংশ জমি ইজারা ও কিছু ব্যাক্তিমালিকানা জমি ভাড়া নিয়ে হাটটি শুরু করা হলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে ক্ষতি ও স্থানীয় জনগণকে ইউনিয়ন পরিষদের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত করে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে জোরপূর্বক আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদের মাঠেই এ হাট বসানো হচ্ছে। দিনে দিনে এটি জেলার অন্যতম বড় গরুর হাটে পরিণত হয়েছে। তবে হাটের দিন বিদ্যালয়টি নামমাত্র খোলা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সব নাগরিক সেবা বন্ধ থাকতে দেখা গেছে।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন কোমলমতি শিক্ষার্থী জানান, বুধবার হাট বসার কারণে শ্রেণি কক্ষে পাঠদান করতে অসুবিধা হয়। হাট শেষে পুরো বিদ্যালয় মাঠ গোবর ও মলমূত্রের আবর্জনায় ভরে যায়। ফলে খেলাধুলা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়ে তাদের। এছাড়া বিদ্যালয়ের মূলফটক দখলে রেখে গরু বেধে রাখায় প্রবেশ করতে তারা আতঙ্কে থাকে। পশুর বর্জ্যে পোশাক নোংরা হয়ে যাওয়ার অভিযোগও করে শিক্ষার্থীরা।
গোপী রায়ের বাজারটি নিকলী বাজিতপুর সড়কের জন্য অভিশাপে পরিনত হয়েছে। প্রতি বুধবার নিকলী বাজিতপুর সড়কে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। জেলার বড় গরু-ছাগলের হাটগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত জারইতলা ইউনিয়নের গোপীরায়ের হাটে বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে ট্রাক, পিকআপ, ভটভটিতে করে পশু আনা হয়। এসব যানবাহন সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিকলী, বাজিতপুর, ভৈরব ও কটিয়াদি সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরসহ নিকলী সদরে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষ এবং পাশের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীবাহী এম্বুলেন্স, যানবাহন মারাত্মক সমস্যায় পড়ে।
নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক মোঃ শফিকুল ইসলাম(৩০) বলেন, সাজনপুর গরুর হাটের দিন বুধবারে সড়কে আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মারাত্মক জ্যাম থাকে। জরুরি রোগী নিয়ে ঐ সড়কে গরু বোঝাই ট্রাক-পিকআপ এগুলো এড়িয়ে আসা যাওয়া করতে বেগ পোহাতে হয়। মুমূর্ষু রোগীকে কাঙ্ক্ষিত হাসপাতালে পৌছে দিতে বিলম্ব হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদের সামনের মাঠে হাট বসানোর কারণে সেদিন পরিষদে কোনো নাগরিক সেবা প্রদান করা হয়নি। পরিষদের সব কক্ষের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জারইতলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ ইসহাক রানা বলেন,গরুর বাজারের দিন পাবলিক পরিষদে একটু কম আসে বুধবারে। গরু এলোপাতাড়ি দৌড়ে তাই ভয়ে আসেন না পাবলিক। তবে, গত বুধবারে সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত উদ্যোক্তা পরিষদে ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
জারইতলা ইউনিয়নের আঠারোবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জোবেদা বেগম বলেন, আপনারা তো এসে স্বচক্ষে পরিস্থিতি দেখেছেন। অন্যান্য দিনের তুলনায় বুধবার হাটের দিন উপস্থিতি কম থাকে শিক্ষার্থীদের, এতে করে সাময়িক সমস্যা হয়। সেই সাথে শিক্ষার পরিবেশ ও নষ্ট হচ্ছে। কোন অভিভাবক এবিষয়ে অভিযোগ করেননি বলে তিনি জানান।
জারইতলা স্কুল এন্ড কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষক বলেন, বুধবারে আঠারোবাড়িয়া সাপ্তাহিক গরুর হাট থাকলে বিদ্যালয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে হাটে আগত ক্রেতা-বিক্রেতারা বিদ্যালয় ছুটির সময়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের কে ইঙ্গিত করে নানান রকমের কুরুচিপূর্ণ কথা বলে থাকে বা মেয়ে শিক্ষার্থীরা ইভটিজিং এর স্বীকার হয়ে থাকেন বলেন জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসার বিষয়ে জানতে চাইলে নিকলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সিদ্দিক জানান,পূর্ববর্তী ইউএনওরা এই হাটের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নিয়ে ছিলেন বলে শুনেছেন। তবে বুধবার হাটের দিন সরজমিনে পরিদর্শন করে কি কি সমস্যা হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির নিকট প্রতিবেদন দাখিল করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
সাজনপুর গরুর হাটের ইজারাদার জমশেদ আলী (৪২) বলেন, সরকারি বিধি ও আইনকানুন অনুযায়ী হাট টি চলছে। ইজারাকৃত জায়গার পাশাপাশি ব্যাক্তি মালিকানা জায়গাও রয়েছে। বিদ্যালয়ের মুলফটক দখল করে গরু বেধে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে, ইজারাদার জমশেদ বলেন বিদ্যালয়ে এবং ইউনিয়ন পরিষদে প্রবেশের জন্য বিকল্প পথ রয়েছে। বুধবার গরুর হাট বসানোর জন্য বিদ্যালয়ে পাঠদানের সময়সূচি পরিবর্তন চেয়ে আবেদন করেছেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন কিছুলোক অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য নিউজ করে ফায়দা লুটার চেষ্টা করেন, সেক্ষেত্রে তিনি তাদের সুযোগ দেয়না বলে জানান তিনি।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছাঃ রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, গরুর হাটের বিষয়ে পূর্বে অবগত ছিলাম না। বর্তমানে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।