
জাহাঙ্গীর আলম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার বেড়তলা গ্রামে জমি বিনিময় (এওয়াজ বদল) সংক্রান্ত একটি আপসনামাকে কেন্দ্র করে চরম ভোগান্তি, অবিচার ও মানবেতর জীবনযাপনের মুখে পড়েছেন বিল্লাল মিয়া ও তাঁর পরিবার। রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়দের প্রতারণা এবং স্থানীয় সাহেব-সরদারদের রহস্যজনক ও পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকায় বর্তমানে পরিবারটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো বেড়তলা গ্রামে তীব্র ক্ষোভ, আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিল্লাল মিয়ার সঙ্গে তাঁর নিকট আত্মীয় আক্কাস মুন্সী, আলী মিয়া ও কালন মিয়া গং-এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি বিনিময় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী সাহেব-সরদাররা মধ্যস্থতার দায়িত্ব নেন। তাঁদের উদ্যোগেই একটি লিখিত আপসনামা প্রস্তুত করা হয় এবং সরদারদের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষ উক্ত আপসনামায় স্বাক্ষর প্রদান করেন।
আপসনামা অনুযায়ী, বিল্লাল মিয়া তাঁর দখলীয় আনুমানিক ৫৫ পয়েন্ট জমি কালন মিয়া গং-এর কাছে ছেড়ে দেন, যাতে তারা সেখানে বসতঘর নির্মাণ করতে পারেন। বিনিময়ে চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল— বিল্লাল মিয়ার বাড়িতে যাতায়াতের সুবিধার্থে অন্তত ৬ ফুট প্রশস্ত একটি চলাচলের রাস্তা স্থায়ীভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
সরল বিশ্বাসে এবং সরদারদের কথার ওপর আস্থা রেখে বিল্লাল মিয়া নির্ধারিত জমি ছেড়ে দিলে কালন মিয়া গং কোনো প্রকার বিলম্ব না করেই সেখানে দ্রুত পাকা ঘর নির্মাণ করে স্থায়ী দখল গ্রহণ করেন। কিন্তু চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত— বিল্লাল মিয়ার জন্য নির্ধারিত রাস্তা— আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রাস্তার জায়গাও সংকুচিত করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
ন্যায়বিচারের আশায় বিল্লাল মিয়া একাধিকবার সাহেব-সরদারদের দ্বারস্থ হলে নতুন নতুন টালবাহানার মুখে পড়তে হয়। কখনো বলা হচ্ছে, “জায়গা মাপা হলে তখন রাস্তা দেওয়া হবে”, আবার কখনো প্রবাসীদের অনুপস্থিতির অজুহাত দেখানো হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি সরদারদের কেউ কেউ বিল্লাল মিয়াকে তথাকথিত ‘আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা’ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন—
“আল্লাহ তোমারে অনেক জায়গা দেবে, এখন যেমন আছে তেমনই থাক।”
ভুক্তভোগী পরিবারের প্রশ্ন, স্বাক্ষরিত আপসনামার মাধ্যমে যদি এক পক্ষ ঘর তুলে স্থায়ী দখল নিতে পারে, তবে অন্য পক্ষ কেন তার ন্যায্য রাস্তার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে? কেন সরদাররা অবৈধ নির্মাণ বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? স্বাক্ষরের মর্যাদা কি কেবল শক্তিশালী পক্ষের জন্যই প্রযোজ্য?
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিল্লাল মিয়ার বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র চলাচলের পথটি বর্তমানে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আগে যে পথ দিয়ে অনায়াসে অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করত, সেখানে এখন মানুষের হাঁটারও জায়গা সংকুচিত। বিল্লাল মিয়ার ভাই অটোচালক মাসুদ মিয়া তাঁর গাড়ি নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে পারছেন না। এতে পরিবারের রোজগার ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এ অবস্থায় কোনো জরুরি পরিস্থিতি— যেমন অগ্নিকাণ্ড, অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে লাশের খাটিয়া বহন করার মতো ন্যূনতম জায়গাটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না। বিষয়টি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন গ্রামের সচেতন মহল।
গ্রামের একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রভাবশালী পক্ষ ও সাহেব-সরদারদের যোগসাজশেই এই অন্যায় সংঘটিত হচ্ছে। প্রবাসীদের আসা কিংবা জায়গা মাপার নামে সময়ক্ষেপণ করে মূলত বিল্লাল মিয়াকে তাঁর মৌলিক চলাচলের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সরদারদের ভূমিকা নিরপেক্ষ না হয়ে একতরফা হওয়ায় ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে প্রতারণার শিকার বিল্লাল মিয়া জানান, সাহেব-সরদাররা যদি দ্রুত তাঁর প্রতিশ্রুত রাস্তা দখলমুক্ত করে বুঝিয়ে না দেন, তবে তিনি স্বাক্ষরিত আপসনামা চ্যালেঞ্জ করে সরাইল থানা, উপজেলা প্রশাসন ও দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেবেন। তিনি বলেন, “বিচারের নামে যে প্রহসন চলছে, তা আর মেনে নেওয়া যায় না। ন্যায্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।”
এ ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বেড়তলা গ্রামে যে কোনো সময় বড় ধরনের সামাজিক ও মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে।