মোঃ মশিউর রহমান
দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ থানার আলোচিত ও দীর্ঘদিনের চাঞ্চল্যকর ক্লু-লেস হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ভাড়াটে খুনি নিয়োগসহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
দিনাজপুর জেলার সুযোগ্য পুলিশ সুপার জনাব মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম-এর দিকনির্দেশনা ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) জনাব মোঃ আনোয়ার হোসেন-এর সার্বিক সহযোগিতায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বীরগঞ্জ থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে এই সাফল্য অর্জিত হয়।
পুলিশ জানায়, বীরগঞ্জ থানার মামলা নং-১২, তারিখ ১৩/১২/২০২৫ খ্রি., ধারা ৩০২/৩৪, পেনাল কোড ১৮৬০-এর তদন্তকালে প্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন কয়েকজনের অবস্থান খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় শনাক্ত করা হয়। এরপর গত ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি. তারিখে ওইসব এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। যদিও তখন অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি, তবে অভিযুক্ত আবু বক্কর ওরফে বাদশার ভাড়া বাসা থেকে একটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী।
পরবর্তীতে গত ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি. তারিখে দিনাজপুর জেলা পুলিশের একটি চৌকস টিম র্যাব-০৬, খুলনার সহযোগিতায় খুলনা রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে মোঃ আবু বক্কর ওরফে বাদশা (২৬), পিতা-মোঃ মোতালেব শেখ, সাং-উৎকুল, থানা-বাগেরহাট সদর, জেলা-বাগেরহাট-কে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত আবু বক্কর ওরফে বাদশার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার অন্যতম আসামি মোঃ শাহ আলম কল্লোল (৫৬), পিতা-মৃত আলহাজ রজব আলী মোল্লা, সাং-মহারাজা মোড়, উত্তর বালুবাড়ী, থানা-কোতয়ালী, জেলা-দিনাজপুর-কে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁর স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে মামলার আরেক আসামি মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি (৪১), স্বামী-মৃত দানিউল ইসলাম, সাং-আরাজি চৌপুকুরিয়া, থানা-বীরগঞ্জ, জেলা-দিনাজপুর-কে নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অভিযুক্ত শাহ আলম কল্লোল ও মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি পরস্পর যোগসাজশে ১০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আবু বক্কর ওরফে বাদশার মাধ্যমে পেশাদার খুনি ভাড়া করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল দানিউল ইসলামকে হত্যা করা।
গত ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি. তারিখ থেকে বীরগঞ্জ থানাধীন আরাজি চৌপুকুরিয়া গ্রামে জিন্দাপীর মেলা চলাকালীন বিপুল লোকসমাগমকে হত্যার জন্য উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেয় অভিযুক্তরা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি দানিউল ইসলামের বাসায় কীভাবে প্রবেশ করা হবে— সে বিষয়ে একটি শর্ট ভিডিও তৈরি করে শাহ আলম কল্লোলের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান।
পরবর্তীতে আবু বক্কর ওরফে বাদশা তাঁর সহযোগী পেশাদার খুনি বাহিনী নিয়ে দিনাজপুর সদরের বালুবাড়ীতে শাহ আলম কল্লোলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দানিউল ইসলামের বাসার চাবি গ্রহণ করেন। পূর্বে করা রেকির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রি. তারিখে আনুমানিক ভোর রাতে দানিউল ইসলামকে নির্মমভাবে হত্যা করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
উল্লেখ্য, নিহত দানিউল ইসলাম পেশায় একজন স্বচ্ছল কৃষক ছিলেন। হত্যার দিন ভোর রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে তাঁর নিজ শয়নকক্ষের বিছানায় মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, রহস্যজনক ও দীর্ঘদিন ক্লু-লেস।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহতের বাড়ি থেকে আনুমানিক ১০০ গজ দূরে একটি পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বাসার তালার চাবি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাহ আলম কল্লোল বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেছেন।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা হলেন—
১. মোঃ আবু বক্কর ওরফে বাদশা (২৬), বাগেরহাট সদর, বাগেরহাট।
২. মোঃ শাহ আলম কল্লোল (৫৬), কোতয়ালী, দিনাজপুর।
৩. মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি (৪১), বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।