প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 3, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jan 11, 2026 ইং
আদানির বিদ্যুৎ-ফাঁদ: একতরফা চুক্তির মাশুল আর কতকাল

মেহেদী হাসান হাবিব
দীর্ঘদিন ধরেই আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, আজ তা রূঢ় বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। বকেয়া পাওনা এবং কয়লা সংকটের অজুহাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেওয়া কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে জিম্মি করার এক সুদূরপ্রসারী ‘বিদ্যুৎ রাজনীতি’। যখন একটি দেশের শিল্প উৎপাদন এবং জনজীবন বিদেশি একটি প্রাইভেট কোম্পানির মর্জির ওপর ঝুলে থাকে, তখন তাকে আর ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’ বলা যায় না, তা রূপ নেয় ‘কৌশলগত শোষণে’।
চুক্তির নামে আইনি শোষণ
শুরু থেকেই আদানি গ্রুপের সাথে হওয়া এই চুক্তিটি ছিল চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশের অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় আদানির কয়লার দাম অনেক বেশি ধরা হয়েছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে বিশাল অংকের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস বসে থাকার মাসুল। আদানির কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নিলেও টাকা দিতে হয়, না নিলেও দিতে হয়—এই যে ‘টেক অর পে’ (Take or Pay) নীতি, এটি আমাদের জাতীয় কোষাগারকে শূন্য করার একটি আইনসম্মত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকরা একে ‘একতরফা চুক্তি’ বলে আসছিলেন, যার চূড়ান্ত ফলাফল আজ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে।
শিল্প খাতে রক্তক্ষরণ
বিদ্যুতের এই কৃত্রিম সংকট সরাসরি আঘাত হানছে আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড—শিল্প খাতে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে আমরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছি। সরবরাহ কমানোর এই সময়কালটিও অত্যন্ত বিতর্কিত; যখন দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই বিদ্যুৎ কমিয়ে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করাকে ‘ইলেকট্রিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা বিদ্যুৎ রাজনীতির নোংরা খেলা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে?
আস্থার সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয়
বাণিজ্যিক সম্পর্কে আস্থা সবচেয়ে বড় পুঁজি। কিন্তু আদানি পাওয়ার যেভাবে হঠাৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে সংকটে ফেলেছে, তাতে সেই আস্থার জায়গাটি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শোষণের কাছে নতি স্বীকার করব, নাকি বিকল্প খুঁজব?
বাংলাদেশকে এখনই তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে:
চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন: আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞদের মাধ্যমে এই একতরফা চুক্তির ধারাগুলো পুনরায় খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে।
উৎস বহুমুখীকরণ: বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো কোম্পানি বা দেশের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ: কয়লার মত আমদানিনির্ভর জ্বালানি বাদ দিয়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মত টেকসই উৎসে দ্রুত রূপান্তর করতে হবে।
শেষ কথা
আদানির এই আচরণ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা। ঋণের জালে বা একতরফা চুক্তির ফাঁদে পড়ে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার পরিণাম কখনোই শুভ হয় না। সময় এসেছে এই ‘বিদ্যুৎ রাজনীতি’র মায়াজাল ছিন্ন করে স্বনির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণের। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন তার চাবিকাঠি নিজের হাতে থাকে, পরের দয়ায় নয়।
স্বত্ব © দৈনিক জনতার খবর ২০২৫ | ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।