
মেহেদী হাসান হাবিব
বর্তমানে বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার—মাঠের খেলা যাই হোক, বোর্ডরুমের লড়াইয়ে ভারত এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আইসিসির নীতিনির্ধারণী থেকে শুরু করে টুর্নামেন্টের সূচি নির্ধারণ, সবখানেই বিসিসিআই-এর অদৃশ্য আঙুলের ছাপ স্পষ্ট।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) এখন কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি একটি বৈশ্বিক ক্রিকেট ক্যালেন্ডার। কোনো দেশের সিরিজ যদি আইপিএলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে সেই দেশের বোর্ড বাধ্য হয়েই সিরিজ পিছিয়ে দেয়। কারণ, খেলোয়াড়রা জাতীয় দলের চেয়ে আইপিএল খেলাকে প্রাধান্য দেয় আর্থিক নিরাপত্তার কারণে। বিসিসিআই এই 'সফট পাওয়ার' ব্যবহার করে অন্য বোর্ডগুলোকে চাপে রাখে।
আইসিসির ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স (F&CA) কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের অবস্থান এবং বর্তমানে জয় শাহর আইসিসি চেয়ারম্যান পদ অলঙ্কৃত করা ভারতের নিয়ন্ত্রণকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। এর ফলে আইসিসির রাজস্বের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৩৮.৫%) একাই পাচ্ছে ভারত।
আপনি আইসিসির দুর্বলতা এবং ফিফার সাথে তুলনা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১. একক বাজার নির্ভরতা: আইসিসির আয়ের প্রায় ৮০% আসে ভারতীয় বাজার থেকে। ভারত যদি কোনো কারণে আইসিসি থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দেয়, তবে আইসিসি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়বে। এই আর্থিক মেরুদণ্ডহীনতাই আইসিসির বড় দুর্বলতা।
২. গণতান্ত্রিক কাঠামোর অভাব: আইসিসিতে মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশের (বিশেষ করে ভারত) হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত। ফিফায় যেমন প্রতিটি সদস্য দেশের সমান ভোটাধিকার কার্যকর ভূমিকা রাখে, আইসিসিতে তা দেখা যায় না।
৩. রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ: এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রিকেট বোর্ডের নিয়োগে সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকে, যা আইসিসি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
ফিফায় ২১১টি সদস্য দেশ আছে এবং তাদের আয়ের উৎস সারা বিশ্বব্যাপী (ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া)। অন্যদিকে ক্রিকেটের বাজার সীমিত। আইসিসি ফিফার মতো হতে চাইলে:
বাজারের বৈচিত্র্য আনতে হবে: কেবল ভারতের ওপর নির্ভর না করে আমেরিকা, চীন বা ইউরোপে ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করতে হবে।
এক দেশ এক ভোট: বড়-ছোট সব দেশের ভোটাধিকারের প্রভাব সমান হতে হবে।
আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ: রাজস্ব বণ্টনের বৈষম্য কমাতে হবে যেন জিম্বাবুয়ে বা আয়ারল্যান্ডের মতো দলগুলো ভারতের দয়ার ওপর নির্ভরশীল না থাকে।
আইসিসি যদি এই 'একক আধিপত্য' থেকে বের হতে চায়, তবে তাদের নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:
গ্লোবাল ফান্ড গঠন: সম্প্রচার স্বত্বের টাকা সরাসরি আইসিসি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং তা সমানভাবে বণ্টন করবে যাতে কোনো দেশ নিজেকে 'মালিক' মনে করতে না পারে।
নিরপেক্ষ ভেন্যু ও সময়সূচি: কেবল ভারতীয় দর্শকদের কথা না ভেবে ক্রিকেটের প্রসারের জন্য স্থানীয় সময় অনুযায়ী খেলার আয়োজন করা।
অলিম্পিকে ক্রিকেট: ২০২৮ অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি বড় সুযোগ। এতে ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশের সরকারের ক্রিকেটে বিনিয়োগ বাড়বে, যা আইসিসির ওপর ভারতের একাধিপত্য কমাতে সাহায্য করবে।