
রহমত আরিফ
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২০তম গ্রেডভুক্ত অফিস সহায়ক পদে জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ইশরাত ফারজানার দেহরক্ষী কনস্টেবল শফিকুল ইসলামের একটি কথোপকথনের কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব প্রশাসনের আওতায় অফিস সহায়ক পদে ২৭টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য গত বছরের ৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির আলোকে অনুষ্ঠিত লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সম্প্রতি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।
ফল প্রকাশের কিছুক্ষণ পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও কল রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে। এতে জেলা প্রশাসকের দেহরক্ষী কনস্টেবল শফিকুল ইসলামকে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। ফাঁস হওয়া কল রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়- ‘ইনশাল্লাহ, আমার ওপর ছাইড়া দেন। এতদিন থেকে থাকিয়া যদি ভাই একটা নিজের কাজগুলো ওঠাতে না পারি, তাহলে থাকার কোনো দরকারই নাই।’
এই কথোপকথন প্রকাশ্যে আসার পর নেটিজেনদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, এটি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অবৈধ লেনদেন ও প্রভাব খাটানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—যেখানে চাকরি পাওয়ার একমাত্র মানদণ্ড মেধা হওয়ার কথা, সেখানে ডিসি কার্যালয়ের দেহরক্ষীর মাধ্যমে ‘নিজের কাজ ওঠানো’র বিষয়টি কীভাবে আসে?
একজন লিখেছেন, ‘ডিসি অফিসে চাকরি মানেই যদি দেহরক্ষীর মাধ্যমে তদবির আর টাকা লাগে, তাহলে সাধারণ পরীক্ষার্থীরা যাবে কোথায়?’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘এই কল রেকর্ড শুধু একজন দেহরক্ষীর নয়, এটি পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার অসুখের প্রতিচ্ছবি। ’
এদিকে নিয়োগে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠার পর জেলা প্রশাসকের দেহরক্ষী কনস্টেবল শফিকুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. বেলাল হোসেন।
এসপি মো. বেলাল হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান ছিল।
যদিও নিয়োগটি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ওই নিয়োগে তার (শফিকুল ইসলাম) বিরুদ্ধে প্রার্থীর পক্ষে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের পক্ষ থেকেই বিষয়টি জানানো হওয়ায় প্রাথমিকভাবে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হবে।
এছাড়া, যার সঙ্গে তার কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়েছে, সেই ব্যক্তির পরিচয়ও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর এ ধরনের কল রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, শুধু প্রত্যাহার নয়—এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কারা কারা জড়িত, কোথায় কোথায় প্রভাব খাটানো হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। নচেৎ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের আস্থা আরও সংকটে পড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে এমন কল রেকর্ড সামনে আসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখানে শুধু একজন দেহরক্ষীর ব্যক্তিগত আচরণের বিষয় নয়, বরং পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার বাইরে কোনো ধরনের তদবির, অর্থ লেনদেন বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকলে তা সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। শুধু দেহরক্ষীকে প্রত্যাহার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না—এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিলেন, তা খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।এ বিষয়ে নিয়োগ-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) রুহুল আমীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি বর্তমানে প্রশিক্ষণে রয়েছেন এবং পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উল্লেখ্য, এর আগেও গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) ডিসি কার্যালয়ের অধীনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে দুইজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।