ইতিহাস যেন আজ তার পুনরাবৃত্তি দেখল এক অনন্য মহিমায়। চার দশক আগে যে রাজপথে প্রিয় নেতার বিদায়ে শোকের প্লাবন নেমেছিল, আজ সেই একই পথ ধরে মহাকালের পথে যাত্রা করলেন বাংলাদেশের রাজনীতির ‘আপসহীন’ ধ্রুবতারা বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালের ৩০ মে’র সেই অবিস্মরণীয় জানাজার কথা আজও প্রবীণদের স্মৃতিতে ভাস্বর, কিন্তু আজ ঢাকার রাজপথ দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। জনমানুষের সেই ঢল আজ কেবল একটি জানাজা নয়, বরং জনসমুদ্রের এক মহাসম্মিলনে পরিণত হয়েছে- যা ছাড়িয়ে গেছে স্মরণকালের সকল রেকর্ড।
শোকের চাদরে আজ ঢাকা জনপদ:- ভোর হওয়ার আগেই ঢাকা শহর যেন এক মৌন মিছিলে রূপ নেয়। দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া- প্রতিটি প্রান্ত থেকে আসা মানুষের গন্তব্য ছিল একটাই।
কবির ভাষায় বলতে গেলে:- "লক্ষ প্রাণের আকুল তিয়াষ, অশ্রু সজল আঁখি, দেশমাতা আজ বিদায় নিলেন, স্মৃতিটুকু যায় রাখি।"
জনতার এই উপস্থিতিকে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার ফ্রেমে বন্দি করা অসম্ভব। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল মানুষের মাথা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজায় যে জনস্রোত দেখে বিশ্ববাসী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়েছিল, আজকের উপস্থিতিকে সেই ইতিহাসেরও এক নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
খালেদা জিয়ার জানাজা আজ ইতিহাসের এক অনন্য মাইলফলক:- তীব্র রোদ কিংবা দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি কোনো কিছুই আজ সাধারণ মানুষকে আটকে রাখতে পারেনি। এ যেন কেবল রাজনৈতিক আবেগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার এক বহিঃপ্রকাশ। মাঠ ছাড়িয়ে রাজপথ, অলিগলি আর ভবনের ছাদে ঠাঁই নেওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন আকাশের মেঘ হয়ে ভাসছিল।
ঘটনার গভীরতা অনুধাবন করতে গিয়ে অনেকে বলছেন, জিয়াউর রহমানের জানাজা ছিল এক শোকাতুর জাতির হাহাকার, আর খালেদা জিয়ার এই শেষ বিদায় হলো এক লড়াকু জনপদের পরম শ্রদ্ধাঞ্জলি। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা আগামী বহু বছর ধরে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।
বিদায়ের সুর যেন হৃদয়ের আর্তনাদে ভাষাহীন শব্দের করুন কাব্যিক অন্তঃধান:- জানাজার ময়দানে যখন ইমামের কণ্ঠে শেষ বিদায়ের ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছিল, তখন পিনপতন নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল শোনা যাচ্ছিল কান্নার রোল। কবরের হিমশীতল ঘরে শায়িত হতে যাওয়া এই নেত্রীকে ঘিরে জনতার এই ভালোবাসা ছিল গোধূলি বেলার ম্লান আলোর মতো-বেদনাদায়ক কিন্তু গভীর।
কাব্যিক চয়নিকায় আজকের এই দৃশ্যপটকে বর্ণনা করা যায় এভাবে:- "রাজপথ আজ সমুদ্র হলো, শোকের নেইকো কুল, ঝরে গেল এক জীবন্ত প্রাণ, রাজনীতির রাজফুল! স্বামীর পাশে শয়ন নিলেন মহিয়সী সেই নারী, ইতিহাস তার সাক্ষী রইল, সজল নয়ন বারি।"
বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় এক অমোচনীয় গণস্বাক্ষর হয়ে রইল। যে জনস্রোত আজ রাজপথ কাঁপিয়েছে, তা প্রমাণ করেছে-ব্যক্তিকে বিদায় দেওয়া যায়, কিন্তু আদর্শের জোয়ারকে নয়, এটাই ইতিহাসের ঐতিহাসিক এক অনন্ত ভালোবাসার প্রেক্ষাপট্।