
মিয়া সুলেমান
কুয়াশায় মোড়া এক শীতল সকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেমেছে গভীর নীরবতা। যে নারী বহু দশক ধরে ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে দেশের রাজনীতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যিনি আপোষহীন নেতৃত্বে হয়ে উঠেছিলেন সময়ের প্রতীক—সেই অপরাজেয় রানির বিদায় যেন একটি যুগের সমাপ্তি। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের বিদায় নয়, এটি সাহস, দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদার এক অধ্যায়ের ইতি। দেশ হারাল তার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়, আর জাতি হারাল একজন অভিভাবকতুল্য নেত্রীকে।
“কুয়াশার আড়ালে হঠাৎ নিঃশব্দ বৃষ্টি,
এক যুগের আলো আজ নিভে গেছে।”
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের টালমাটাল সময়ে তিনি রাজনীতির কঠিন ময়দানে পা রেখেছিলেন। ১৯৮১ সালের অস্থির সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার যে সাহসিকতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা একজন সাধারণ রাজনীতিকের নয়—তা ছিল একজন রানির দৃঢ় পদচারণা। প্রতিকূলতা, ষড়যন্ত্র ও সংকটের মধ্যেও তিনি অবিচল থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯১ সালে গণরায়ের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের ইতিহাসেও স্থায়ী ছাপ রেখে যান।
“ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক লৌহমানবী,
সময়ও থেমে তাকিয়েছে তাঁর দিকে।”
তার শাসনামলে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ছিল যুগান্তকারী। সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে যুগান্তকারী উদ্যোগ এবং সামাজিক অগ্রগতির পথে দৃঢ় অঙ্গীকার তাকে আলাদা উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষায় অবৈতনিক সুযোগ ও উপবৃত্তি কর্মসূচি ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সাহসী বিনিয়োগ—যা একজন দূরদর্শী শাসকের পরিচয় বহন করে।
“শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে,
একটি জাতি নিজের পথ খুঁজেছিল।”
ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন দৃঢ় অথচ সংযত। রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতায় থেকেও তার আচরণে ছিল নীরব সৌম্যতা, কণ্ঠে সংযম, আর সিদ্ধান্তে আপসহীন দৃঢ়তা। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, ব্যক্তিগত বেদনা ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি মাথা নত করেননি। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি যেন হয়ে উঠেছিলেন এক নীরব প্রহরী—যিনি ইতিহাসের ভার বহন করেও পরাজয় মানেননি।
“নীরবতাও কথা বলে,
যখন সাহসই হয়ে ওঠে ইতিহাস।”
আজ এই বিদায়ের ক্ষণে রাজনৈতিক বিভাজন স্তব্ধ। দল-মত নির্বিশেষে জাতি উপলব্ধি করছে—তিনি কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের এক অনমনীয় অভিভাবক। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, সংগ্রাম ও আপোষহীন নেতৃত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
“কিছু মানুষ বিদায় নেন না,
তারা কেবল কিংবদন্তি হয়ে যান।”
বেগম খালেদা জিয়া—একটি নাম নয়, একটি অধ্যায়। তিনি কেবল আপোষহীন নেত্রী নন—তিনি অপরাজেয় রানি।