
মোঃ মশিউর রহমান
ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাচীন জলাশয়, মসজিদ-মন্দির ও বিস্তীর্ণ সবুজ বনভূমি দিনাজপুরকে উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করেছে।
কান্তজীর মন্দির: টেরাকোটার অনন্য নিদর্শন
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলার ঢেপা নদীর তীরে অবস্থিত কান্তজীর মন্দির বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ টেরাকোটা শিল্পকর্মের অন্যতম নিদর্শন। মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭০৪ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং তাঁর পুত্র রাজা রামনাথ রায়ের শাসনামলে ১৭৫২ সালে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
একসময় নবরত্ন বা নয় শিখরবিশিষ্ট এই মন্দিরটি ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মন্দিরের দেয়ালে প্রায় ১৫ হাজার পোড়ামাটির ফলকে মহাভারত, রামায়ণ ও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির চিত্র ফুটে উঠেছে, যা দর্শনার্থীদের গভীরভাবে মুগ্ধ করে।
রামসাগর দিঘি: প্রাচীন জলাধারের নীরব সৌন্দর্য
দিনাজপুর শহরের অদূরে অবস্থিত রামসাগর দিঘি জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন কৃত্রিম জলাশয়। পলাশীর যুদ্ধের পূর্বে রাজা রামনাথ রায় জনসাধারণের পানির চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে এই দিঘি খনন করেন। প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই দিঘির চারপাশে সারিবদ্ধ বৃক্ষরাজি এর সৌন্দর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র।
নয়াবাদ মসজিদ: ইসলামী স্থাপত্যের নিদর্শন
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নয়াবাদ মসজিদটি নির্মিত হয় ১৭৯৩ সালে, মোগল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয়ের শাসনামলে। ইট, টেরাকোটা ও টাইলস দিয়ে নির্মিত এই মসজিদে রয়েছে একাধিক গম্বুজ, দরজা ও জানালা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কান্তজীর মন্দির নির্মাণে নিয়োজিত মুসলিম কারিগররাই এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। ফলে এটি ধর্মীয় সহাবস্থান ও শিল্পকলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
দিনাজপুর রাজবাড়ী: অতীত গৌরবের নীরব সাক্ষী
দিনাজপুর রাজবাড়ী জেলার নামকরণের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঐতিহাসিকদের মতে, রাজা দিনরাজ ঘোষ অথবা পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধের রাজা গণেশ এই রাজবাড়ীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। রাজবাড়ী প্রাঙ্গণে কুমার মহল, আয়না মহল, রানী মহল, কালিয়া জিউ মন্দির, রানী পুকুর ও চম্পা তলা দীঘিসহ বহু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আজও দৃশ্যমান।
যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এসব স্থাপনা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও রাজবাড়ীটি দিনাজপুরের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে টিকে আছে।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান: প্রকৃতির সবুজ আশ্রয়
দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত সিংড়া জাতীয় উদ্যান একটি প্রাকৃতিক শালবন। ৩৫৫ হেক্টর আয়তনের এই বনাঞ্চলকে ২০১০ সালের ১০ অক্টোবর জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
শীত মৌসুমে উদ্যানটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, খরগোশ, শিয়ালসহ নানা বন্যপ্রাণীর বিচরণ লক্ষ্য করা যায়।
যোগাযোগ ব্যবস্থা
ঢাকা থেকে দিনাজপুরে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। বিমানযোগে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে সড়কপথে সহজেই দিনাজপুর শহরে আসা যায়।
উপসংহার
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সমৃদ্ধ সমাহার নিয়ে দিনাজপুর উত্তরাঞ্চলের পর্যটন মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে এই জেলার ঐতিহ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও ব্যাপকভাবে পরিচিত হতে পারে।