প্রিন্ট এর তারিখঃ Mar 1, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Dec 17, 2025 ইং
অসংখ্য যুদ্ধে সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হাফিজুর রহমান

এস এম নাছির উদ্দীন
নির্ভীক, দুঃসাহসী বীর,মোঃ হাফিজুর রহমান
ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলাকে যে সমস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মগ্রহণ করে জাতিকে ধন্য করেছেন অকুতোভয়, নির্ভীক, দুঃসাহসী বীর হাফিজুর রহমান তাদের অন্যতম।
হাফিজুর রহমান ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে ভরভরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতার নাম মরহুম আব্দুর রহিম সওদাগর।
ভরভরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শুরু করেন।পরে ১৯৬৫ সালে ধলা হাই স্কুল থেকে এসএসসি ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ আখতারুজ্জামান কলেজ থেকে এইচএসসি এবং নাসিরাবাদ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ সালের পূর্ব থেকেই অসহযোগ আন্দোলনের অংশগ্রহণ করেছিলেন মোঃ হাফিজুর রহমান। ময়মনসিংহ ইউপি আর ক্যাম্প দখলে প্রত্যক্ষ অংশ নিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দেন।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর ক্যাম্প দখলের পর ময়মনসিংহ জেলার স্কুলে প্রতিষ্ঠিত সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হতে অস্ত্র ট্রেনিং সহ গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
ময়মনসিংহ শহরে হানাদার বাহিনীর প্রবেশের দুইদিন পূর্বে শহর ত্যাগ করেন।
প্রথমে নিজ গ্রামে পরে বর্তমান ত্রিশাল থানার আমিরা বাড়ি,মোক্ষমপুর, জামতলী ও সাধুয়া এলাকা হতে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে রায়মনি গ্রামে তৎকালীন আইয়ুব আলী কে নিয়ে স্থানীয় যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করান।
জুন মাসের প্রথম দিকে কিছু অস্ত্র ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু মুক্তিযোদ্ধা সহ ভালুকায় আফসার মেজরের সাথে যোগ দেন।
২৫ জুন ১৯৭১ সালে ভালুকা থানার ভাওয়ালিয়া বাজু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
আফসার মেজরের সাথে যোগাযোগের পর হতে দেশমুক্ত হওয়ার পর পর্যন্ত বহ দায়িত্ব পালন করেছেন।
হাফিজুর রহমানের সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য সসহকারী সেকশন কমান্ডার, সেকশন কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার,প্রশাসনিক অফিসার ইনচার্জ এবং সর্বশেষ মুক্ত ময়মনসিংহ শহরের রাবেয়া মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুলে স্থাপিত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পের মেজর আফসার উদ্দিন আহমেদের সহকারী অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ময়মনসিংহ সদর দক্ষিণ ও ঢাকা সদর উত্তর এই বিরাট অঞ্চলে (মুক্ত অঞ্চল) মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বপ্রকার কার্যক্রম পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় অন্যান্য সকল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সেটআপ এর জন্য বিশেষ অবদান রেখেছেন হাফিজুর রহমান।
মেজর আফসার পরিচালিত "আফসার ব্যাটালিয়ান "এর আওতাধীন সাবসেক্টর এলাকায় আফসার সহকারী হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা, কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা, হাসপাতাল, জাগ্রত বাংলা পত্রিকা স্থানীয় ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করার সুবিধার্থে গঠিত হয় গ্রাম বাহিনীর তদারকি করেছেন হাফিজুর রহমান।
২৫ শে জুন ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ১৫ শত হানাদার বাহিনীর একদল ভালুকা যাওয়ার পথে ভাওয়ালিয়া বাজুতে আফসারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধ ৪৮ ঘন্টা স্থায়ী হয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধা মান্নান এই যুদ্ধে শহীদ হন।
এই যুদ্ধে প্রায় দেড়শতাধিক পাকসেনা নিহত হয়।
৪৮ ঘন্টা যুদ্ধের পর পাকবাহিনী হেলিকপ্টার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছনে ছত্রীসেনা অবতরণ করেছিল। এই যুদ্ধে হাফিজুর রহমানের ছিল বিরাট অবদান।
১৭ জুলাই ১৯৭১ মেজর আফসারের নেতৃত্বে গফরগাঁও থানার দেউলপাড়া এলাকায় পাক বাহিনীর দখলদার ট্রেনের উপর আক্রমণ করে হাফিজুর রহমান।
এই যুদ্ধে পাক ৭ সেনা নিহত হন।
২৩ শে জুলাই ১৯৭১ আইয়ুব আলী ও হাফিজুর রহমান তাদের দল নিয়ে ত্রিশাল এলাকায় গোলাভিটা এলাকায় একদল ডাকাতের নৌকা আক্রমণ করে তিনটি রাইফেল ও ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে নিয়ে যান।
অসমসাহসী হাফিজুর রহমান পহেলা আগস্ট ১৯৭১ সালে তিনি তার দল নিয়ে ধলাও রামঅমৃতগজ্ঞ স্টেশনের মাঝ পথে পাক বাহিনীর একটি টহলরত ট্রেনে হাফিজুর রহমান আক্রমণ চালান।
৪/৯/ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিলদার আহমেদ, আব্দুল মোতালেব, আমজাদ হোসেন ও মহিউদ্দিন সহ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ভালুকা থানার ভরাডোবা ও মেদুয়ারী এলাকায় রাজাকারদের এক বিরাট দলের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হন এই যুদ্ধে ২২ জন রাজাকার নিহত হয়।
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ হাফিজুর রহমান আইয়ুব আলী দিলদার মোহাম্মদ সহ ভালুকা থানার বাসিন্দা কোম্পানি হেডকোয়ার্টারের দিকে অগ্রসর হলে মমতাজ উদ্দিন খান হাফিজুর রহমান শামসুদ্দিন মনির উদ্দিন ও আব্দুল মোতালেব সহ পাক বাহিনীর সাথে দীর্ঘ চার ঘন্টা যুদ্ধ অবতীর্ণ হয়।
এই যুদ্ধে পাক বাহিনীর ১৪ জন নিহত হন।
১১/ ১০ /১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাইন্দা ও বড়াইত এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়। হাফিজুর রহমান সহ কাসেম, কছিম উদ্দিন এর দল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বেশ কিছু পাকসেনা ও রাজাকারকে হত্যা করে।
১৫/ ১০/ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহাখালী রেলস্টেশনের দক্ষিণী ফরচুঙ্গীর ব্রীজে পাক বাহিনীর উপর আক্রমণ করেন।
মশাখালী রেলস্টেশন ও পুলের বাজারে আক্রমণ করে রাজাকার ১৫ জনকে নিহত করেন।
২০০ গজ রেলপথ উড়িয়ে ফেলা হয়।
মাইন বিস্ফোরণের সময় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শহীদ হন।
১৬/১০ /১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে শিলা নদীর পুলের পাহারাদারদের আক্রমণ করলে ৪ রাজাকার নিহত হয়। এই দিন রাতে আবার ফরচুঙ্গী পুরের পাহারাদারদের আক্রমণ করেন এর ৪ রাজাকার অস্ত্র সহ আত্মসমর্পণ করে।
১৭ অক্টোবর ১৯৭১ আবার শিলা নদীর পুলে আক্রমণ হয় পাহারাদার রাজাকার কমান্ডার নিহত হন।
২৯/ ১০/১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে শিলা বাজারে রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করা হয় পাঁচ জন রাজাকার নিহত হয়।
২২/১০/১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মশাখালী এলাকায় রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করা হয়।
১৬/১০/৭১ তারিখে আত্মসমর্পণকৃত রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষেই যুদ্ধ করতে যেয়ে তারা ৪ জন শহীদ হন।
৩১ /১০/ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে গফরগাঁও থানার রসুলপুর বাজারে ক্যাম্প আক্রমণ করেন এই যুদ্ধে ২২ জন রাজাকার নিহত হয়।
মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানি কমান্ডার মমতাজ উদ্দিন শহীদ হন।
১৪-১১-১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে গফরগাঁও থানা ও আওলাজুড় গ্রামে রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ হয়।
২/১২ /১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ভালুকা রাজৈ রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ হয়।
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মশাখালী ব্রিজ পাহাড়ারত রাজাকারদের আক্রমণ করা হয় মেজর আফসার তার দল নিয়ে পাক বাহিনীর পিছনে ধাওয়া করেন।
পরদিন ৯ই ডিসেম্বর ১৯৭১ গফরগাঁও পাক বাহিনীর ক্যাম্প দখল করে ঐদিন গফরগাঁও মুক্ত হয় ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল।
৯ডিসেম্বর ৭১ রাত্রি হাফিজুর রহমান ত্রিশালের ১০৬ জন রাজাকার কে অস্ত্র সহ আত্মসমর্পণ করান। ত্রিশাল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে।
একই দিনে হাফিজুর রহমান তার দল নিয়ে ময়মনসিংহ পলিটেকনিক্যাল পর্যন্ত আসেন এবং ময়মনসিংহ মুক্ত করার জন্য অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধে আফসার ব্যাটালিয়ন নামক পুস্তক রচনা করেন এবং এই সময়েই প্রকাশের কথা হয়।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস এর নামে ৯ম খন্ডে উক্ত মুক্তিযুদ্ধে আফসার ব্যাটালিয়ন পুস্তিকাটি ছাপা হয়েছে।
এই বীর অসমসাহসী মুক্তিসেনা হাফিজুর রহমান শেষ জীবনে- জীবন বীমা কর্পোরেশনে ময়মনসিংহ জেলার ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্বত্ব © দৈনিক জনতার খবর ২০২৫ | ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।