
মোঃ জীবন
আজ সেই মহিমান্বিত দিন, ১৬ই ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ এবং দুই থেকে চার লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির ললাটে মুক্তিসূর্য উদিত হয়েছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত অত্যাচার, সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়ন এবং পূর্ব বাংলাকে শোষণ-বঞ্চনার নীল নকশা চিরতরে গুঁড়িয়ে দিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। আজ এই বিজয়ের ৫৫ বছর পূর্তিতে গোটা জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছে সেই বীর সেনানীদের এবং স্বাধীনতার সোপানে দৃঢ় সংকল্পিত প্রত্যয়ের বিজয়োল্লাস উদযাপন করছে মহান বিজয় দিবস।
পটভূমির প্রেক্ষাপটে্ শোষণের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন:- ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন শুরু করে, তার চূড়ান্ত রূপ ছিল মায়ের ভাষা বাংলাকে কবর দিয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য চেষ্টা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে দ্রোহের বীজ বপন হয়েছিল, তা ধাপে ধাপে ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
বাঙালির এই নব উদ্দীপনার প্রেরণা ও মুক্তির আহবানে ভীত হয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা একতরফাভাবে পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখার ও শোষণ-নিপীড়নের মাধ্যমে বঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। এরই প্রেক্ষাপটে্, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে তারা শুরু করে "অপারেশন সার্চলাইট" নামক এক নির্মম গণহত্যা।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা পথ ও বিজয়ের আলোকশিখা:- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার যে সু-প্রভাত ও মুক্তির আহ্বান ছিল— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”- তা-ই মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে ফাগুনের আগুন হাওয়ার তেঁজদীপ্ত উদ্দীপনা সঞ্চার করে। ২৫শে মার্চের পর পরই শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।
দীর্ঘ নয় মাসের এই সংগ্রামে বাঙালি জাতি এক অভূতপূর্ব ঐক্য ও দেশপ্রেমের পরিচয় দেয়। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক-সর্বস্তরের মানুষ মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রণাঙ্গনে। মিত্রবাহিনীর সহায়তায় এবং স্বাধীনতাকামী জনগণের দৃঢ় প্রত্যয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অত্যাচারী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বাংলা ও বাঙালির বিজয় মুক্তির মুক্ত আলো নিয়ে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মহান বিজয়, জন্ম নেয় বিশ্ব দরবারের মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে্ মাতৃত্বের দাবিদার এই দেশের বিজয় উল্লাস;- বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে, দেশমাতা মা এবং এই দেশের মাতৃত্বের অহংকার ও গর্বিত স্বাধীনতার সূর্যকে নিজের দেশ ও জাতির উল্লাসে উদযাপিত করবার লক্ষ্যেই আজ দেশজুড়ে চলছে উৎসবের আমেজ।
* জাতীয় কর্মসূচি সমূহ:- রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা মন্ডলী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়েছে।
* ঐতিহ্যের গৌরবে বিজয় দিবসে গর্বিত আজকের বাংলাদেশ:- রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সকল সরকারি, বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত ভবনে পত পত করে উড়ছে লাল সবুজের জাতীয় পতাকা। এই পতাকাই ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত মুক্তির প্রতীক।
* বিজয় সোপানের দৃঢ় সংকল্প:- বিজয় দিবসের এই দিনে জাতি নতুন করে শপথ নিচ্ছে-শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি দুর্নীতিমুক্ত, উন্নত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ করার।
বিজয় দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, দীর্ঘদিনের শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত উত্থান এবং অদম্য সংকল্পের প্রতিচ্ছবি। তেঁজদীপ্ত হৃদয় আলিঙ্গনে এই জাতি আজ অহংকারে অহংকারী বিজয় গর্বে গর্বিত বাঙালি জাতি হিসেবে নিজেদের বিজয়কে উদযাপিত করছে। আজকের এই দিনটি বাঙালি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তাদের মুক্তি এসেছে রক্তের বিনিময়ে, আর এই স্বাধীনতা রক্ষা করার অঙ্গীকার প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দেশাত্মবোধের প্রেমিও চেতনায় হিল্লোলিত হোক আগামীর বাংলাদেশ।