
সরকারি চাকরিতে বদলি একটি রুটিন মাফিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কিছু কিছু বিদায় মুহূর্ত সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যায়, তৈরি করে এক শূন্যতা। তেমনই এক আবেগঘন বিদায়ের সাক্ষী হলো টুঙ্গিপাড়া উপজেলাবাসী। যার নির্ঘুম রাত আর অক্লান্ত পরিশ্রমে অপরাধ দমনে স্বস্তি ফিরেছিল জনমনে, সেই জনবান্ধব মানবিক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলামের বিদায়ে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া,যা টুঙ্গিপাড়া থানার ইতিহাসে খুবই ব্যতিক্রম।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তার সময় কালটা ছিল টুংগীপাড়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ক্রিটিকাল ও অগ্নিগর্ভা টুংগীপাড়া। পুরো বাংলাদেশ তথা বিশ্ব যে সময়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। এ সময় অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু তার কৌশলী, বিচক্ষণ ও জনবান্ধব পদক্ষেপে, মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকায় অন্য যেকোনো সাধারণ থানার মতোও কোন ঘটনা ও ঘটেনি। তাছাড়া কোন ঘটনা ঘটার উপক্রম দেখা দিলে, সবার আগে আমরা ঘটনাস্থলে তাকে পেয়েছি। এটাও ছিল টুংগীপাড়ায় একটা অনন্য চিত্র। তার সেবার কোন ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না কোন বৈষম্য। ধর্ম বর্ণ সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে তিনি সেবা দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে ওসি তিনি ছিলেন আপসহীন। তার যোগদানের পূর্বে এলাকায় যেসব ছোট-বড় অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তা দমনে তিনি গ্রহণ করেন কঠোর পদক্ষেপ। অপরাধ দমনে তার 'জিরো টলারেন্স' নীতি এবং রাতজাগা টহল উপজেলার সাধারণ মানুষকে দিয়েছিল গভীর নিরাপত্তা বোধ।
বিশেষ করে মাদক নির্মূল, সন্ত্রাস দমন, ইভটিজিং রোধ এবং জুয়া বন্ধে তার নেওয়া সাহসী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপগুলো ছিল সর্বমহলে প্রশংসনীয়। আক্ষরিক অর্থেই, ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরের নির্ঘুম পরিশ্রমের ফসল ছিল উপজেলার মানুষের শান্তির ঘুম। তার কঠোর নজরদারির কারণে অপরাধীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, যার ফলে দীর্ঘদিনের অশান্ত পরিবেশ শান্ত হয়ে ওঠে।
তবে শুধু কঠোর পুলিশিং নয়, ওসি জাহিদুল ইসলামের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তার সাধারণ মানুষেরষ সাথে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু। থানার দরজা তিনি সবার জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। ধনী-দরিদ্র, প্রভাবশালী কিংবা সাধারণ দিনমজুর—নির্বিশেষে সবাই তার কাছে সমান ন্যায়বিচার পেতেন। বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ মনোযোগ সহকারে শোনা এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।
তার বদলির সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করছেন।
স্থানীয় এক প্রবীণ সমাজসেবকের মতে, "ওসি জাহাঙ্গীর সাহেব আসার পর আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছি। তার মতো সৎ ও কর্মঠ অফিসার চলে যাওয়া আমাদের জন্য বড় ক্ষতি। তিনি যেখানেই যান, ভালো থাকুন।"
উপজেলার সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতে, তার সময়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কোনো ভয় ছিল না। তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পেরেছেন।
বিদায় বেলায় ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, "আমি শুধু আমার ওপর অর্পিত
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছি। এই উপজেলার মানুষ ও আমার সহকর্মীরা আমাকে যে ভালোবাসা ও সহযোগিতা করেছেন, তার জন্য টঙ্গীপাড়া উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ এবং আমার সহকর্মীদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। আমার কাজের মাধ্যমে যদি সামান্যতম শান্তিও আমি দিতে পেরে থাকি, তবে সেটাই আমার সার্থকতা।"
ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর হয়তো কর্মস্থল ত্যাগ করছেন, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত শান্তির ভিত এবং মানুষের ভালোবাসা তাকে এই উপজেলায় চিরস্মরণীয় করে রাখবে। তার নতুন কর্মস্থলেও সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকুক—এটাই এখন পুরো উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা।