
রবিন হোসেন মুক্তিযুদ্ধের পরপরই এক তরুণ তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা থেকে পাড়ি জমান ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে। হাতে সামান্য পুঁজি, বুকভরা স্বপ্ন। তিনি জানতেন না, জীবনের পরের কয়েক দশক তাকে এক নতুন পরিচয় এনে দেবে—‘আচারওয়ালা বাশার মিয়া’।
মাতুয়াইলে আগমন
আশির দশকের শুরুতে বাশার মিয়া এসে পৌঁছান মাতুয়াইলে। ছোট্ট এক টোকরিতে সাজানো থাকতো নানা রকম আচার। সকাল হলে তিনি হাঁটা ধরতেন মাদ্রাসা বাজার থেকে। সেখান থেকে মাতুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, কেরানীপাড়া, দিনার বাড়ি, ঠাকুর বাড়ি, দক্ষিণ পাড়া বটতলা, ইনুপট্টি, পশ্চিম পাড়া হয়ে দিনের শেষ করতেন কাউন্সিল এলাকায়।
স্বাদের ইতিহাস
তার আচার ছিল ভিন্ন স্বাদের। টক, মিষ্টি আর ঝাল—তিন স্বাদের এমন মিশ্রণ যেন অন্য কোথাও মিলত না। জলপাই, আম, বরই, চালতা, আমসত্ত, তেঁতুল—প্রতিটি আচারেই ছিল এক অদ্ভুত টান। মাতুয়াইলের এমন পরিবার পাওয়া ভার, যেখানে বাশার মিয়ার আচার একবারও ওঠেনি ভাতের টেবিলে।
মানুষ বাশার মিয়া
বিক্রেতা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন আপন। কথায়-বার্তায় ছিল সহজ-সরল ভাব। কারও কাছে দেনা-পাওনা বাকি থাকলে তাতেও তার আপত্তি ছিল না। মানুষকে ভালোবাসতেন, আর মানুষও তাকে সেই ভালোবাসা ফিরিয়ে দিত।
মেলার স্মৃতি
প্রতি বছর কেরানীপাড়া মেলায় তার দোকান বসতো। মেলায় যারা যেতেন, তারা একবার হলেও তার আচারের দোকানে দাঁড়াতেন। তার আচার ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। শেষবার তিনি দোকান দিয়েছিলেন ২০১৯ সালে।
বিদায়
দীর্ঘ চার দশক ধরে আচার বিক্রি করে মাতুয়াইলের মানুষের জীবনে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সময়ের নিয়মে বয়স তাকে ক্লান্ত করল। একদিন তিনি সব ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেলেন নিজের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। তারপর থেকে আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হলো না তার।
রয়ে যাওয়া স্মৃতি
আজও অনেকেই মনে মনে খোঁজেন বাশার মিয়ার আচার। মনে পড়ে সেই টোকরির ভেতর সাজানো জলপাই, আম, বরই, চালতা, আমসত্ত, তেঁতুল আচার। মনে পড়ে তার মিষ্টি হাসি আর সরল কথাগুলো। বাশার মিয়া শুধু একজন আচার বিক্রেতা ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন মাতুয়াইলের মানুষের স্মৃতির অংশ, ভালোবাসার মানুষ, এক অমলিন ইতিহাস।