
সাইফুল ইসলাম
কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়ানী গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের সুপেয় খাবার পানির একমাত্র ভরসা একটি পুকুর। নিরাপদ পানির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় শতাধিক পরিবার প্রতিদিন এই পুকুরের পানিই পান, রান্না ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ বিলের মাঝে অবস্থিত পুকুরটি পদ্ম পাতায় আচ্ছাদিত। সেই পুকুরের এক কোণ থেকেই কলসি ও হাঁড়ি নিয়ে পানি সংগ্রহ করছেন নারীরা। ছবিতে দেখা যায়, পাকা ঘাটের ওপর দাঁড়িয়ে একজন নারী পুকুর থেকে পানি তুলছেন, পাশে অপেক্ষায় আরও কয়েকজন। এই পানিই শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার নিত্যপ্রয়োজন মেটাচ্ছে।
বিলের মধ্যে অবস্থিত জেলা পরিষদের পুকুরে যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নারীদের।পুকুরে যাতায়াতের জন্য দুটো ভাসমান সেতু থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। নিরাপদ পানির অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা ভাসমান সেতু পার হয়ে বিলের পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন এলাকার নারীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রাম ও লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি দুটো ভাসমান সেতু দীর্ঘদিনের অবহেলায় ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সেতুর ওপরের লোহার প্লেট মরিচা ধরে একাধিক স্থানে ফুটো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নিচের নীল ড্রাম দেখা যাচ্ছে। সামান্য ভুলে পা ফেললেই যে কেউ পানিতে পড়ে যেতে পারেন। তবুও এই ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই প্রতিদিন নারী ও কিশোরীরা বিলের পুকুরে গিয়ে পানি আনছেন।
নয়ানী গ্রামের রেশমা বলেন, '২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলায় নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আমাদের পুকুরে যাওয়ার রাস্তা একেবারে হারিয়ে গেছিল। তখন থেকে খাল সাঁতরে বা দূরের চিংড়িঘেরের আইল ঘুরে পানি আনতে হতো। এমনও হয়েছে পড়ে গিয়ে কয়েকজন নারীর গর্ভের সন্তানও নস্ট হয়েছে।'
২০০৯ সালের সেই প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের পর বদলে যায় নয়ানী গ্রামের ভূগোল। যেখানে ছিল শুকনো মাটির পথ, সেখানে এখন খাল। গ্রামের মানুষ বহু বছর ধরে কাদা মাড়িয়ে বা সাঁতরে পুকুরে যায় পানি আনতে। কারও কলস ডুবে যেত, কেউ পিছলে পড়ত—তবু বিকল্প ছিল না।
বহু বছরের সেই দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে ২০২১–২২ অর্থবছরে উপজেলা প্রশাসন ‘লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (লজিক)’ প্রকল্পের আওতায় খালের ওপর ভাসমান সেতু নির্মাণ করে। ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর লোহার অ্যাঙ্গেল ও টিনের শিট বসিয়ে তৈরি করা হয় ৩১১ ফুট দীর্ঘ সেতুটি। ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ হলে আশপাশের গ্রামগুলোয় দেখা দেয় স্বস্তির হাসি।
কিন্তু সেই হাসি টিকল না ছয় মাসও। লবণাক্ত বাতাসে লোহার সেতুতে মরিচা ধরে, টিনের পাত উঠে যায়, হাতল ভেঙে পড়ে। এখন সেতুর নিচের ড্রামগুলোই শুধু পানিতে ভাসছে, উপরে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
এক গৃহবধূ জানান, “পানি ছাড়া তো চলা যায় না। ভয় লাগে ঠিকই, কিন্তু উপায় নেই। কখন যে দুর্ঘটনা ঘটে, বলা যায় না।”
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বারবার জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলেও এখনো টেকসই সেতু সংস্কার বা নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নারী ও শিশুদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সথানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, 'তখন আমরা কইছিলাম, সেতুর বদলে বালুর বস্তা ফেলাই সড়ক বানানি হোক, কিন্তু কেউ শুনিনি। বড় অফিসাররা আইসে সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন, সেতু বানালি নাকি দীর্ঘদিন টিকবে। কিন্তু নির্মাণের ছয় মাস পরই ভাইঙে গেছে। এখন পুকুরে পানি আনতে যাওয়া, বিল থেকে ধান বা গরু আনা–নেওয়ায় মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতি হচ্ছে।
মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারী বলেন, 'মানুষের কষ্ট কমাতে ভাবছিলাম ভাঙা সেতু কাঠ দিয়ে অস্থায়ীভাবে মেরামত করব। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি, সেটা সম্ভব না। এখন বড় বাজেট দরকার। ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তা ফান্ড পরবর্তী বাজেট পেলেই আমরা প্রকল্প নিয়ে নতুন করে সেতুটি সংস্কার করবো।